প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 28 Sep 2026, 8:41 AM
যে স্থাপনাগুলো একদিন গড়েছিলেন, সেগুলোর সামনে দাঁড়ালেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া
শ্যামল রুদ্র
সময় বদলায়, বদলে যায় দায়িত্বও—কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে যায় ইট-কাঠের নীরব সাক্ষী হয়ে। রামগড়ের এমনই কিছু স্থাপনার সামনে দাঁড়ালে যেন এক লহমায় মিলে যায় অতীত আর বর্তমান। প্রায় দুই দশক আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে যেসব উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল, শুক্রবার সেসবেরই কয়েকটি স্থাপনা ঘুরে দেখলেন তিনি। বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে এই কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রামগড় সফরের শুরুতেই তিনি পা রাখেন উপজেলার সদর ইউনিয়নের নূরপুর এলাকায়, তৈচালা পাড়া সংলগ্ন এক পরিত্যক্ত ভবনের সামনে—যা একদিন গড়ে উঠেছিল অনাথ ও এতিম বালক-বালিকাদের আবাসিক স্কুল হিসেবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে। একসময় যেখানে ছিল নিঃসহায় শিশুদের শিক্ষার স্বপ্ন, দীর্ঘদিনের অবহেলায় আজ সেই জায়গা নীরব, নিস্তব্ধ, প্রায় ভুতুড়ে। ভবনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে দেখেন তিনি, খোঁজ নেন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রকল্পের অতীত-বর্তমান নিয়ে। তৎকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে স্বয়ং ওয়াদুদ ভূঁইয়াই উদ্বোধন করেছিলেন এই ভবনের। কিন্তু বিদ্যালয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায়, বছরের পর বছর ধরে তা পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়। এখন এটি বিধ্বস্ত।
এই স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নিজেরও গভীর স্মৃতি। পরিদর্শনকালে তিনি জানান, তৎকালীন সময়ে বোর্ডের অর্থায়নে জায়গা কিনে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এই আবাসিক অবকাঠামো। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি—সবই এগিয়েছিল একে একে; কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের ঝড়ে থমকে যায় সেই স্বপ্নযাত্রা। বিগত সরকার আর কখনো ফিরে তাকায়নি এই প্রকল্পের দিকে। কণ্ঠে স্পষ্ট আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, এটি সত্যিই বড় কষ্টের বিষয়—এখানে সব সম্প্রদায়ের শিশুরাই আশ্রয় পেত, অথচ আজ তা কেবলই পরিত্যক্ত এক স্মৃতিচিহ্ন। তাঁর এই আক্ষেপের সঙ্গে সুর মেলান পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অনুপ কুমার চাকমাও। তিনি বলেন, এমন সুন্দর একটি জায়গা দেখে তিনি নিজেই বিস্মিত—শিক্ষার মতো পবিত্র ক্ষেত্রে রাজনীতি কেন প্রবেশ করবে, প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর কথায়, এই ভবন শুধু একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়, বরং বঞ্চিত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ—যা সত্যিই বেদনাদায়ক।
সেখান থেকে তিনি এগিয়ে যান রামগড় কেন্দ্রীয় কবরস্থান-সংলগ্ন অসমাপ্ত টাউন হল ভবনের দিকে, এরপর যান রামগড় লেক পরিদর্শনে। একসময় উন্নয়নের রূপরেখায় গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা এই স্থাপনাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অপূর্ণ থেকে গেছে, আর তাই এখন নতুন করে জেগে উঠেছে এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। এই পরিদর্শনপর্বে তাঁর সঙ্গে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ছালে আহম্মেদ, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক মিন্টু, জেলা বিএনপির সহসভাপতি হাফেজ আহম্মদ ভূঁইয়া, রামগড় উপজেলা বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক সাফায়েত মোর্শেদ ভূঁইয়া মিঠু, পৌর বিএনপির সভাপতি বাহার উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক শেফায়েত উল্ল্যাহসহ জেলা, উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
দিনের আলো নিভে এলে সন্ধ্যায় রামগড় শিল্পী কমিউনিটি সেন্টারে জমে ওঠে আরেক আয়োজন—উপজেলা ও পৌর বিএনপির যৌথ উদ্যোগে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভা। উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় উঠে আসে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম চাঙ্গা করা, তৃণমূলকে সক্রিয় রাখা এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির প্রসঙ্গ। রাত তখন দশটা ছুঁইছুঁই, তিনি পৌঁছান রামগড়ের শ্রীশ্রী দক্ষিণেশ্বরী কালীবাড়িতে। মন্দির কমিটির সভাপতি বাদল চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক স্বপন দে-সহ কমিটির নেতৃবৃন্দ ও উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যরা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান তাঁকে। পরে স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিনিময় হয় শুভেচ্ছা। মন্দিরের আঙিনায় দাঁড়িয়ে যেন সময় ফিরে যায় তাঁর ছেলেবেলায়—পূজার দিনগুলোয় এই মন্দিরেই আরতি করার স্মৃতি রোমন্থন করেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। দীর্ঘদিনের এই নিবিড় সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে মতবিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানান তিনি, পাশাপাশি মন্দিরের দশমী ঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দেন।
পরদিন শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে বসে আরেকটি মানবিক আয়োজন—সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০টি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুনর্বাসন সহায়তা। প্রতিটি পরিবার পায় দুই বান্ডিল করে ঢেউটিন ও তিন হাজার টাকার চেক, যা নিজ হাতে তুলে দেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক কাজী শামীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব, আর ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজন বিবেচনায় ভবিষ্যতেও এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
রামগড় সফরের এই কয়েকটি পর্ব যেন একই ফ্রেমে ধরে রাখল অতীত আর বর্তমানকে। যে সময় ওয়াদুদ ভূঁইয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন, তখনকার হাতে নেওয়া কিছু প্রকল্পের স্থাপনা আজ দাঁড়িয়ে আছে তাঁরই চোখের সামনে—কোনোটি পরিত্যক্ত, কোনোটি অসমাপ্ত, আবার কোনোটি অপেক্ষায় আছে নতুন প্রাণ পাওয়ার। আর আজ তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে বহন করছেন পাহাড়ের উন্নয়ন আর সমস্যা সমাধানের নতুন দায়িত্ব। রামগড়ের পুরোনো এই স্থাপনাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর এবারের পরিদর্শন যেন এক নীরব সেতুবন্ধ রচনা করল—পুরোনো স্বপ্নের অসমাপ্ত বাস্তবতা আর নতুন দায়িত্বের মধ্যে।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
কুমিল্লায় আবারও কিশোর গ্যাংবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান
আয়েশা আক্তারকুমিল্লায় আবারও কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ ও গোয়...
মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবিতে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদ...
হোমনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধিকুমিল্লার হোমনায় মেঘনা নদীতে মর্মান্তিক ট্রলারডুবির ঘটনায় নিহত পাঁচজনের পর...
বাঞ্ছারামপুরে নিখোঁজের ৬দিন পর তিতাস নদী থেকে উদ্ধার হাত-পা...
ফয়সল আহমেদ খান, বাঞ্ছারামপুর প্রতিনিধিব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে নিখোঁজের ৬ দিন পর তিতাস নদী থেকে...
''দেশে তিন কোটি মানুষ খাদ্যজনিত রোগে ভুগছে''
কুমিল্লা প্রতিনিধি কুমিল্লায় আয়োজিত উত্তম কৃষি চর্চা বিষয়ক কৃষক প্রশিক্ষণে বক্তারা বলেন, দেশ...
অধ্যক্ষকে ফাঁসাতে ভর্তি ফরমে আওয়ামী স্লোগান, কলেজ ইনচার্জকে...
ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।।কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলা করিম বক্স হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ...
কুমিল্লায় ৪১ কার্যদিবসে ২ হাজার ৪৪০ জনকে আইনি পরামর্শ লিগ্যা...
কুমিল্লা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির কার্যক্রমের আওতায় ৪১ কার্যদিবসে ২ হাজার ৪৪০ জনকে আইনি পরামর্শ দেওয়া...