আয়েশা আক্তার
এজলাসে বসেছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার। সামনে অপেক্ষমাণ ছিলেন দলিলদাতা ও গ্রহীতারা। তাদের মধ্যেই ছিলেন অসুস্থ এক ব্যক্তি—হুইলচেয়ারে করে স্বজনদের সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলেন দলিল নিবন্ধনের জন্য। কিন্তু এজলাসে সাব-রেজিস্ট্রার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তার দলিল নিবন্ধন হয়নি। অসুস্থ অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অনেক অনুরোধ করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এমন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে। সাব-রেজিস্ট্রারের অনিয়মিত উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে অচলাবস্থার কারণে প্রায় দেড় সপ্তাহ ধরে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন জমি কেনাবেচা ও বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের জন্য শত শত মানুষ কার্যালয়ে এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার আইরিন রহমান সনি অসুস্থতার কারণে নিয়মিত অফিস করছেন না। কখন অফিস করবেন, কখন দলিল নিবন্ধন হবে—এ বিষয়ে সেবাগ্রহীতাদের আগাম কোনো তথ্যও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে অফিসে পৌঁছানোর পর জানতে পারছেন, দলিল নিবন্ধন হবে না।
সবচেয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সাব-রেজিস্ট্রার এজলাসে উপস্থিত থাকা অবস্থায়ও কেন অসুস্থ সেবাগ্রহীতার দলিল নিবন্ধন করা হলো না?
এজলাসে ছিলেন, তবুও ফিরতে হলো অসুস্থ মানুষকে; সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাব-রেজিস্ট্রার আইরিন রহমান সনি কার্যালয়ে আসেন। তিনি এজলাসে অবস্থান করলেও অসুস্থতার কথা জানিয়ে প্রায় বেলা ১১টার দিকে অফিস ত্যাগ করেন।
এ সময় দলিল নিবন্ধনের আশায় কার্যালয়ে অপেক্ষা করছিলেন অনেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন হুইলচেয়ারে আসা এক অসুস্থ সেবাগ্রহীতা। স্বজনরা তাকে অনেক কষ্ট করে কার্যালয়ে নিয়ে এলেও শেষ পর্যন্ত দলিল নিবন্ধন না হওয়ায় তাকে ফিরে যেতে হয়।
অসুস্থ ব্যক্তির স্বজন বলেন, অসুস্থ মানুষকে নিয়ে অনেক কষ্ট করে এখানে এসেছি। ভেবেছিলাম আজ কাজটি শেষ হবে। সাব-রেজিস্ট্রার এজলাসে ছিলেন। তারপরও কাজটি হলো না। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ মানুষটিকে নিয়েই ফিরে যেতে হয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের প্রশ্ন—একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষ যখন হুইলচেয়ারে করে অফিসে এসেছেন, তখন এজলাসে থাকা অবস্থায় তার প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা হলো না কেন?
মনোহরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সহকারী হাসিনা বলেন, গত মঙ্গলবার সকালে স্যার সাড়ে ৯টার মধ্যে অফিসে আসেন। ১১টার মধ্যে স্যার অসুস্থ বলে চলে যান। ওইদিন কোনো দলিল করেন নাই। কবে থেকে নিয়মিত অফিস করবেন, তা আমাদের কারোর জানা নাই। তার এই বক্তব্যে দেড় সপ্তাহ ধরে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কার্যালয়ে আসা সেবাগ্রহীতারা জানান, দলিল নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে তাদের দিনের পর দিন সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এরপর যাতায়াত খরচ করে অফিসে এসে যদি জানতে হয় সাব-রেজিস্ট্রার নেই বা দলিল হবে না, তাহলে তাদের ভোগান্তির শেষ থাকে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী দলিলদাতা বলেন, দূর থেকে অনেক কষ্ট করে অফিসে এসেছি। এখানে এসে জানতে পারি সাব-রেজিস্ট্রার অসুস্থ। আগে থেকে জানালে এত দূর থেকে আসতাম না। আমাদের সময় ও টাকাও নষ্ট হলো।
এক পুরুষ দলিলগ্রহীতা মতিউর রহমান বলেন, অসুস্থ রোগীকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নিয়ে এসেছি। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় কোনো কাজই হলো না। কবে আবার দলিল হবে, সেটিও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
আরেক নারী সেবাগ্রহীতা আমেনা বেগম বলেন, অফিসে কে আছেন, কে নেই—এটা আগে থেকে জানানো উচিত। আমরা সাধারণ মানুষ। দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ানোর মতো সময় বা সামর্থ্য আমাদের নেই।
আরেক দলিলদাতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, একটি দলিল নিবন্ধনের জন্য সুদুর ঢাকা থেকে কয়েকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। সবাইকে সময় দিতে হচ্ছে, যাতায়াত খরচ হচ্ছে। কিন্তু কাজ না হওয়ায় সবাইকে ফিরে যেতে হচ্ছে। এভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। আবার আসতে হবে সেই ভোগান্তির শেষ নেই।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার নিয়মিত অফিসে না থাকলেও এ বিষয়ে কার্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান নোটিশ বা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। ফলে মানুষ আগে থেকে কিছু না জেনেই দূর-দূরান্ত থেকে কার্যালয়ে ছুটে আসছেন।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তার অনুপস্থিতির তথ্য জানাতে একটি নোটিশ দেওয়াও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে কীভাবে?
তাদের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রার অসুস্থ হলে বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে বিকল্প কর্মকর্তা দিয়ে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রম চালু রাখা উচিত। তা না হলে একজন কর্মকর্তার অনুপস্থিতির খেসারত দিতে হচ্ছে শত শত সাধারণ নাগরিককে।
বিষয়টি নিয়ে জেলা সাব-রেজিস্ট্রারের (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা খালিদ মোহাম্মদ বিন আসাদ বলেন, মনোহরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রারের অনুপস্থিতির বিষয়টি তিনি মৌখিকভাবে জানতে পেরেছেন। এজলাসে থাকা অবস্থায় অসুস্থ সেবাগ্রহীতা ফেরত গিয়েছে বিষয়টি অপ্রত্যাশিত। আমরা লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সেবাগ্রহীতারা দূর-দূরান্ত থেকে এসে সাব-রেজিস্ট্রার এজলাসে থাকা অবস্থায়ও যদি সেবা না পেয়ে ফিরে যান, বিষয়টি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার আইরিন অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় নিয়মিত অফিস করতে না পারায় সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।
একজনের অনুপস্থিতিতে বন্ধ সরকারি সেবা—দায় কার? মনোহরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে প্রতিদিন জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা, হেবা, বন্ধক, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন, নিবন্ধিত দলিলের নকল বা সার্টিফাইড কপি, জমির মালিকানা ও দলিলের রেকর্ড তল্লাশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়ার কথা।
কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে এসব সেবা ব্যাহত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মকর্তার অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির কারণে একটি সরকারি কার্যালয়ের কার্যক্রম দিনের পর দিন অচল থাকবে কেন?
সচেতন নাগরিক মহল বলছে, কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অসুস্থতার বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করেই দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব। একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে না পারলে বিকল্প কর্মকর্তা দিয়ে নাগরিক সেবা সচল রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। একই সঙ্গে অফিসে সেবা দেওয়া সম্ভব না হলে আগেই নোটিশ দিয়ে জনগণকে জানানো দরকার।
এদিকে সাব-রেজিস্ট্রার আইরিন রহমান সনির বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এজলাসে উপস্থিত থাকা অবস্থায় অসুস্থ সেবাগ্রহীতার দলিল কেন নিবন্ধন করা হয়নি, দেড় সপ্তাহ ধরে কার্যক্রম কেন ব্যাহত হচ্ছে এবং কবে থেকে তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করবেন—এসব বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।