প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 1 May 2026, 9:21 AM
শিক্ষা, সততা ও আদর্শের বাতিঘর ব্রাহ্মণপাড়ার মোশারফ হোসেন খান চৌধুরী
মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা কেবল ইট কাঠের দালান নির্মান নয় বরং একটি জাতি গড়ার মহৎ উদ্যোগ। আলোকিত মানুষের জীবন কাহিনি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় , তারা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সততা এবং সুদূর প্রসারী ভিশন নিয়ে। নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন।বলিউড বিখ্যাত ছবি, মাঝি দ্য মাউন্টেন ম্যান’ এর মত হাতুড়ি, শাবল নিয়ে পাথর ভেঙে
রাস্তা নয়, তিনি বানিয়েছেন মানুষ গড়ার অট্রালিকা শিক্ষার বাতিঘর। এসএসসির আগেই বাবাকে হারিয়েছিলেন। মোশাররফের ছোট কাঁধে তখন সংসারের বড় বোঝা। সেই ভার কমাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন কাতারে।
মোশাররফ নিজে বেশি দূর পড়তে পারেননি। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ভাই-বোনদের পড়িয়েছেন। ঘামে ভেজা টাকায় এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—দুটি কলেজ, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি মাদরাসা ও একটি কিন্ডারগার্টেন। গড়েছেন দুটি পাঠাগারও। দুই কোটি টাকা সমমূল্যের জমি দিয়েছেন ডায়াবেটিক হাসপাতালের জন্য।
দানবীর মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বলেন, ‘পড়ালেখার মূল্য আমি বুঝি। জীবিকার তাগিদে এইচএসসি দিয়েই পাড়ি জমাতে হয়েছে বিদেশে। কিন্তু আমার মন পড়ে ছিল দেশে। টাকার অভাবে এলাকার কারো যেন পড়া বন্ধ না হয়, সে জন্য এত কিছু করা। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এখন দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভাবলেই মন নেচে ওঠে খুশিতে।’
বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষটির পুরো নাম মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। জন্ম কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন স্কুলশিক্ষক।
নিজ গ্রাম ধান্যদৌল তো বটেই, আশপাশের কোনো গ্রামে ছিল না কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ নিয়ে দফায় দফায় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সভা। স্কুল করতে সবাই উৎসুক, কিন্তু জমি দিতে কেউ আগ্রহী নয়। এগিয়ে এলেন তরুণ মোশাররফ। একদিন এক সভায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কাতারে ঘাম বেচে কিছু পয়সা জোগাড় করেছি। সেটা দিয়েই স্কুলের জন্য জমি কিনব।’
তাকে বাহবা দিল সবাই। পরে শুধু জমি নয়, স্কুলের অবকাঠামো থেকে শুরু করে সবই করে দিয়েছেন মোশাররফ। ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু করল মোশাররফের প্রথম বিদ্যার বাতিঘর—আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। এমপিওভুক্ত হওয়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন হাজারের মতো শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মচারী ২৪ জন।
নিউইয়র্কে পাড়ি : সে বছরই একটা সুযোগ পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি জমান মোশাররফ। সেখানেও শুরুতে ছিলেন নির্মাণশ্রমিক। পরে রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করেছেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পেলেন মোশাররফ। এর পর থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন মুল্লুকে ট্যাক্সি ক্যাব চালাচ্ছেন। প্রচুর আয়, তবে অন্যদের মতো ভাবেননি কেবল নিজের সুখের কথা। বাড়ি-গাড়ি বা আয়েশি জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করেননি অঢেল অর্থ। আয়ের বেশির ভাগই উজাড় করে দিয়েছেন নিজ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে।
১৯৯৯ সালে তিনি গড়ে তোলেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। পরে গড়েছেন ‘আশেদা-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা’, ‘মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা ও ‘মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন’। কঠোর পরিশ্রম করে জমানো টাকা যে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্যয় করছেন তা নয়।
আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি ও ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার নামে এলাকায় দুটি গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য ২ কোটি টাকা ব্যয়ে জমিও কিনে দিয়েছেন। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন। টাকার অভাবে গরিব ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষাবঞ্চিত না হয়, সে জন্য নিজের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত বৃত্তি পেয়েছে ২০০ শিক্ষার্থী। ফাউন্ডেশন থেকে ঘর করে দিয়েছেন ১০টি গৃহহীন পরিবারকে।
মোশাররফের গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশ ভালোভাবেই চলছে। শিক্ষার মানও যথেষ্ট ভালো। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বড় মাঠ। তার নামের কলেজটি এখন চারতলা ভবন। কলেজটিতে এখন ১০ বিষয়ে স্নাতক ও এক বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী প্রায় ৫ হাজার। এইচএসসির ফলাফলের দিক থেকে কুমিল্লা বোর্ডের সেরা ১০ কলেজের একটি এটি।
ব্যক্তিজীবনে দুই সন্তানের জনক তিনি। প্রবাসে এখনো মেসে থাকেন। স্ত্রী-সন্তানেরা থাকেন স্বদেশে। তাদের কখনো যুক্তরাষ্ট্রে নেননি। কারণ কী? ‘মেসে আমি যেনতেনভাবে থাকতে পারি। আলুভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়ে চলে যায় তিন বেলা। পরিবার নিয়ে গেলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হতো। তাতে খরচ অনেক বেড়ে যেত। বরং সেই টাকা দেশের মানুষের কাজে লাগাতে চেয়েছি।’ সরল-সোজা উত্তর মোশাররফের। এ জন্য স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানালেন তিনি।
মোশাররফের বয়স এখন ৬২ বছর। তরুণ বয়সে পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও তিনি এখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটা কলেজে স্নাতকে পড়ছেন। পরীক্ষার সূত্রেই এসেছেন দেশে। বললেন, ‘পড়াশোনার কোনো বয়স নেই। আবার নতুন করে শুরু করতে চেয়েছি।’
ভোগ নয়, ত্যাগের দর্শনে বিশ্বাসী মোশাররফ। বললেন, ‘আমি আনন্দে বাঁচি। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে চিত্ত নেচে ওঠে আমার। যত দিন বাঁচি—আনন্দের খোরাক নিয়েই বাঁচতে চাই। ব্রাহ্মণপাড়ার প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চাই ।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
১০ জনের প্যারাগুয়েকেও হারাতে পারল না তুরস্ক
এফএনএস স্পোর্টস: বিশ^কাপে টিকে থাকার লড়াইয়ে জয় ছাড়া বিকল্প ছিল না তুরস্কের| কিন্তু পুরো দ্বিতীয়ার্ধ...
হাইতিকে উড়িয়ে বিশ^কাপে ছন্দে ফিরল ব্রাজিল, জোড়া গোলে নায়ক কু...
এফএনএস স্পোর্টস: বিশ^কাপের প্রথম ম্যাচে হোঁচট খাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিল ব্রাজিল| ফিলাডেলফিয়...
প্রাকৃতিক উপায়ে রোদে পোড়া ত্বকের দাগ দূর করুন
এফএনএস ¯^াস্থ্য: রোদে পোড়াভাব থেকে হাত-পায়ের ত্বককে রক্ষা করতে আমরা ঘরে বসেই আমাদের ত্বকের সহজ কিছু...
পাকিস্তান সীমান্তে পৃথক দুটি বোমা হামলা নিহত ৭
এফএনএস বিদেশ:পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে পাহাড়ি এলাকার রাস্তার পাশে পু...
‘পুষ্পা ২’ পদদলন মামলা, আদালতে হাজিরার নির্দেশ আল্লু অর্জুনক...
এফএনএস বিনোদন: ‘পুষ্পা ২: দ্য রুল’ সিনেমার প্রিমিয়ার শো ঘিরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পদদলনের ঘটনায় আদাল...
প্রথমার্ধের তিন গোলে ব্রাজিলের স্বস্তির জয়
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের খেলা চলছে তখন। দারুণ ফিনিশিংয়ে গোল করে কোমর দুলিয়ে নেচে উদযাপন করলেন ভিনিস...