আয়েশা আক্তার
কুমিল্লা নগরীর রাজপথে হঠাৎ শতাধিক কিশোর-তরুণের দেশীয় অস্ত্রের মহড়া। কারও হাতে রামদা, কারও হাতে চাপাতি, কারও হাতে লাঠিসোঁটা। দলবদ্ধভাবে সড়ক দাপিয়ে বেড়ানোর সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আতঙ্কে দোকানের শাটার নামিয়েছেন ব্যবসায়ীরা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।
পুলিশের ভাষ্য, এদের একটি দল ‘ক্রাইম সেটাপ’ নামে পরিচিত। ঘটনার পর থেকে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়—বরং শুরু হচ্ছে আরও বড় প্রশ্নের।
কিশোরদের হাতে অস্ত্র আসছে কোথা থেকে? কে দিচ্ছে টাকা? মাদক বা অপরাধের অর্থের জোগানদাতা কারা? এসব কিশোরকে সংগঠিত করছে কে? আর তাদের পেছনে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা অপরাধী নেটওয়ার্ক থাকলে সেই নেটওয়ার্কের শিকড় কতদূর?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর দিতে হবে কিশোরদের পাশাপাশি অস্ত্র, মাদক, অর্থ ও যোগাযোগের উৎসের দিকে।
ভাটারপুকুর থেকে চানপুর—শতাধিক কিশোরের মহড়া, সম্প্রতি নগরের ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার হয়ে চানপুর সারোয়ার স্কুল রোড এলাকায় শতাধিক কিশোর-তরুণের সংঘবদ্ধ মহড়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
পুলিশ জানিয়েছে, মহড়ায় অংশ নেওয়া দলটি ‘ক্রাইম সেটাপ’ নামে পরিচিত একটি নতুন কিশোর গ্যাং হতে পারে এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানও শুরু করেছে।
কাপ্তানবাজারের এক ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হঠাৎ একদল কিশোর রামদা হাতে চিৎকার করতে করতে আসতে দেখে ভয়ে দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। চানপুর এলাকার এক অভিভাবকও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এদের অনেকেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী বলে শুনেছেন এবং সন্তানদের বাইরে পাঠাতেও ভয় তৈরি হয়েছে।
একদিনের ঘটনা নয়, দীর্ঘদিনের সমস্যা
কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে রতন, ঈগল, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ বস’সহ একাধিক গ্রুপের নাম সংবাদে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে নগরে অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাংয়ের নাম উঠে আসার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে রানীর দিঘিরপাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া এলাকাতেও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কিশোরদের মহড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অস্ত্রের মহড়া ও ককটেল বিস্ফোরণের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও সংবাদে আসে।
অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন নামে গ্রুপের আবির্ভাব এবং অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ নগরীর অপরাধচিত্রে একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাহলে পেছনে কারা? এখানেই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, কিশোরদের পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতা থাকতে পারে।
কিশোরদের সঙ্গে কারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখে? অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসে?
মাদক কেনার টাকা আসে কোথা থেকে?
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তাদের নির্দেশনা দেয় কি না? মামলার পর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর ঘটনা আছে কি না?
এগুলো যাচাই করতে প্রয়োজন সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল যোগাযোগের তথ্য, আর্থিক লেনদেন, মামলার নথি, গ্রেপ্তার ও জামিনের ধারাবাহিক তথ্য এবং অস্ত্র-মাদক উদ্ধারের মামলার তদন্ত।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে ‘ক্রাইম সেটাপ’ প্রসঙ্গ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ‘ক্রাইম সেটাপ’ নামের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি মামলার তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় যাচাই সাপেক্ষ।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়ার এবং প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হাকিমও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদকসহ বিভিন্ন অপকর্ম বন্ধে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
মাদক ও আধিপত্যের সংঘাত—গুলিবিদ্ধ স্কুলছাত্র, কিশোর গ্যাং, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারের সম্পর্ক নিয়েও রয়েছে উদ্বেগজনক ঘটনা।
২০২৬ সালের ২৫ জুন কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ গুলিবিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকায় পাঠানো হয়।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মো. শাহজাহান তখন জানিয়েছিলেন, গুলিটি ওই শিক্ষার্থীর ফুসফুস পর্যন্ত আঘাত করেছিল; ঝুঁকি বিবেচনায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়—অপরাধী গ্রুপের দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও নিরপরাধ কিশোররাও হতে পারে।
আইনজীবীর চোখে আইনি জটিলতা
কুমিল্লায় কিশোর অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিংকু বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়স নির্ধারণ নিয়ে অনেক সময় আইনি জটিলতা দেখা দেয়। স্কুলের সার্টিফিকেটে প্রকৃত বয়সের সঙ্গে অসঙ্গতি বা বয়স গোপনের প্রবণতা থাকলে তা বিচারপ্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—গ্রেপ্তার ও মামলা হওয়ার পর পরবর্তী পর্যায়ে কী হচ্ছে?
কে জামিন পাচ্ছে, কার মামলা কোন পর্যায়ে আছে, পুনরায় অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ কার বিরুদ্ধে রয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ না করলে কিশোর গ্যাংয়ের পুনরুত্থানের প্রকৃত কারণ বোঝা কঠিন।
২০২৬ সালের এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে কুমিল্লা নগরে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের কথাও উঠে আসে। তবে প্রতিটি মামলায় ব্যক্তির ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষকরা বলছেন—শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়, শিক্ষাবিদদের মতে, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া কুমিল্লায় মাদক ও কিশোর গ্যাংবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের শপথ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাঝিগাছা আক্তারুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মাদক ও কিশোর অপরাধ থেকে দূরে থাকার শপথ করানো হয়।
শিক্ষকদের বক্তব্যের মূল জায়গাটি হলো—একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তাকে চিহ্নিত করা, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি বাড়ানো।
নাগরিক সমাজের প্রশ্ন—নিয়ন্ত্রণকারীদের সামনে আনতে হবে, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক লিখিল চন্দ্র রায় সাম্প্রতিক সশস্ত্র মহড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত করার এবং কিশোর গ্যাংকে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণকারীদের সামনে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি কিশোর ও তরুণদের বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
অর্থাৎ নাগরিক সমাজের প্রশ্নও একই জায়গায়—শুধু সামনে থাকা কিশোরদের গ্রেপ্তার নয়, তাদের পেছনের কাঠামো থাকলে সেটিও শনাক্ত করতে হবে। অস্ত্রের উৎস কোথায়? একটি কিশোরের হাতে রামদা বা চাপাতি পৌঁছানো নিজেই একটি তদন্তের বিষয়।
আর যদি কোনো গ্রুপের হাতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন আরও বড় হয়—এসব অস্ত্র কোথায় তৈরি হচ্ছে, কোথা থেকে সংগ্রহ হচ্ছে, কে বহন করছে এবং কীভাবে একটি সংগঠিত দলের হাতে পৌঁছাচ্ছে?
একইভাবে মাদকের ক্ষেত্রেও শুধু ব্যবহারকারী কিশোরকে আটক করলেই সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ হয় না। প্রয়োজন সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নজরদারির বাইরে নয়, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের মহড়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেওয়ার ঘটনাও সংবাদে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সংরাইশ এলাকায় একটি দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম ঘোষণা দিয়ে মহড়া দিয়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কারণ এখন শুধু রাস্তায় টহল দিলেই হবে না—অপরাধী গ্রুপের অনলাইন যোগাযোগ, মহড়ার ঘোষণা, অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও এবং গ্রুপভিত্তিক প্রচারণার দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে।
নগরবাসীর নিরাপত্তা কোথায়? কাপ্তানবাজারের ব্যবসায়ী থেকে চানপুরের অভিভাবক—সবার উদ্বেগের জায়গা এক। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে ফেরার অপেক্ষা থাকবে, নাকি কখন কোথায় গ্যাংয়ের সংঘর্ষ শুরু হয় সেই আতঙ্কে থাকতে হবে? কাটাবিলে সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছে স্কুলছাত্র। শহরের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে মহড়ার অভিযোগ উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এসব ঘটনার ভিডিও।
ফলে প্রশ্ন শুধু কিশোরদের নয়; প্রশ্ন নগরীর সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার। অনুসন্ধানের পাঁচটি মূল প্রশ্ন কুমিল্লার কিশোর গ্যাং সমস্যার গভীরে যেতে হলে অন্তত পাঁচটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত প্রয়োজন— এক. অস্ত্রের উৎস: অস্ত্র কোথা থেকে আসছে এবং সরবরাহকারীরা কারা?
দুই. অর্থের উৎস: মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা অন্য অপরাধের পেছনে অর্থের জোগান কোথা থেকে? তিন. প্রাপ্তবয়স্ক সহযোগী:
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র কিশোরদের ব্যবহার করছে কি না? চার. পুনরাবৃত্ত অপরাধ: মামলা ও জামিনের পর একই ব্যক্তি পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে কি না?
পাঁচ. অনলাইন নেটওয়ার্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি, সদস্য সংগ্রহ, মহড়ার ঘোষণা ও অস্ত্র প্রদর্শনের সঙ্গে কারা যুক্ত? শুধু গ্রেপ্তার নয়, ভাঙতে হবে অপরাধের শিকড় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজন—এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু কিশোরদের গ্রেপ্তার করেই যদি তদন্ত থেমে যায়, তাহলে একই এলাকায় নতুন নামে নতুন গ্রুপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে কিশোর সদস্যদের পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস, মাদক সরবরাহ, অর্থের লেনদেন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক সহযোগীদের ভূমিকা থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বের করে আনা জরুরি।
একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রে বয়স ও আইনি অবস্থান অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা, কাউন্সেলিং, শিক্ষায় ফেরানো এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
কারণ কিশোর গ্যাং শুধু পুলিশের সমস্যা নয়। এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদকবিরোধী ব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং বিচারব্যবস্থার সমন্বিত চ্যালেঞ্জ। শেষ প্রশ্ন—‘ক্রাইম সেটাপ’ কি কেবল একটি নাম?
কুমিল্লার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নতুন করে সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। আজ একটি গ্রুপের নাম ‘ক্রাইম সেটাপ’, কাল হয়তো অন্য কোনো নামে আরেকটি দল আত্মপ্রকাশ করবে। সামনে থাকবে কয়েকজন কিশোর; কিন্তু তাদের হাতে অস্ত্র, পেছনে অর্থ এবং পাশে যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নেটওয়ার্ক থাকে, তাহলে শুধু সামনের সারির কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
তাই এখন প্রয়োজন নাম নয়, নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। প্রয়োজন কিশোর নয়, অপরাধের পুরো সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান করা। প্রয়োজন অভিযোগ নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক বা সহযোগীদের চিহ্নিত করা।
নগরবাসীর প্রত্যাশা—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই অনুসন্ধানেই যাবে। আর কুমিল্লার কোনো কিশোরের হাতে বইয়ের বদলে অস্ত্র তুলে দেওয়ার পেছনে যদি সত্যিই কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বা সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্ক থাকে, তদন্তের মাধ্যমে সেটিও প্রকাশ্যে আসবে।