কুমিল্লা প্রতিনিধি
একের পর এক মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি), আদালতের নির্দেশ ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে স্মারকলিপি—কিছুতেই থামছে না একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য। বরং চলমান মামলা ও গ্রেপ্তারি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে। দীর্ঘ এক যুগ ধরে এই চক্রের টার্গেটে রয়েছেন পেশাজীবী ও সাংবাদিক মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র ও তাঁর পরিবার।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মুখে মাস্ক, মাথায় হেলমেট এবং নাম্বার প্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে চড়ে চক্রের সদস্যরা নিয়মিত তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের অনুসরণ করছে। কখনও ভুয়া প্রশাসনিক পরিচয়, কখনও হ্যান্ডকাফ ও জ্যাকেট ব্যবহার করে অপহরণ ও জিম্মি করার মতো অপরাধেও তারা জড়িত।
সাংবাদিক মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র জানান, তাঁর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, আমলী আদালত-১, কুমিল্লা সি আর মামলা নং-৬১৫/২৬, তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২৬ গ্রহণ করে তদন্তের জন্য কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় তিনজন নামীয় আসামি ও ৫-৬ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে বিবাদী করা হয়েছে।
এছাড়া ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়ের হওয়া এফআইআর নং-৫১ ও জিআর মামলা নং-৮১২/২০২৫, ধারা ৩৯২/৩৪-এ অভিযোগ করা হয় যে, দুর্বৃত্তরা হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়ে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে এবং তাঁর স্মার্টফোন, নগদ টাকা ও ক্যামেরা লুট করে নিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড হলেও কয়েকজন আসামি এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, বর্তমানে একই ধরনের অপরাধের ঘটনায় তিনটি মামলা ও দুটি জিডি বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল ও ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং মানহানিকর কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখেও একই অপরাধী চক্র আবারও অনুসরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক শুভ্র। তাঁর ভাষ্য, চলমান সি আর মামলা, জিআর মামলা, জিডি এবং আদালতের নির্দেশ থাকার পরও অভিযুক্তরা বেপরোয়া হয়ে অপরাধ করে যাচ্ছে এবং প্রকাশ্যে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অভিযুক্তরা আগাম ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন সময়ে অপরাধ সংঘটিত করছে, প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে এবং নানা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
এ ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সিসিটিভি ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য, ডিজিটাল আলামত ও মামলার নথি বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব।
তারা দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, সাংবাদিক মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলমান অপরাধের রহস্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এক দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলা, জিডি ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলোর তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি চলমান মামলার মধ্যেও একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে এবং নতুন কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়, সেগুলোও তদন্তের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।