আয়েশা আক্তার
পহেলা বৈশাখে কুমিল্লার রাজগঞ্জ বাজারে বসেছে শতবর্ষী মাছের মেলা। দুই দিনব্যাপী এ মেলায় ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও গত বছরের তুলনায় মাছের সরবরাহ কিছুটা কম বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
১৪ ও ১৫ এপ্রিল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাজগঞ্জ বাজার ছাড়িয়ে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে মাছের এই বিশাল আয়োজন। একদিকে রাজগঞ্জ ট্রাফিক মোড়, অন্যদিকে মোগলটুলি এলাকার কুমিল্লা হাইস্কুলের ফটক পর্যন্ত শুধু মাছ আর মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বড় আকারের মাছ ঘিরেই ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
কুমিল্লার পাশাপাশি নোয়াখালী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দাউদকান্দি ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা মাছ নিয়ে এসেছেন। মেলায় রুই, কাতলা, বোয়াল, চিতল, মহাশোল, আইড়, গজারসহ বড় মাছের পাশাপাশি কই, টেংরা, পুঁটি, মলা, শিং ও বাইমসহ দেশীয় ছোট মাছও পাওয়া যাচ্ছে।
ক্রেতার সাধারণ জানান, প্রতি বছর এই দিনের জন্য তারা অপেক্ষা করেন। নতুন বছরের শুরুতে মেলা থেকে মাছ কেনার আনন্দটাই এক অন্য এরকম আনন্দদায়ক। দরদাম করে মাছ কেনার মজাটাই আলাদা, ঘুরে দেখে পছন্দের মাছ কিনতেই বেশি আগ্রহ দেখা যায়।
ব্যবসায়ীরা বলেন, নববর্ষকে ঘিরে আগেভাগেই তারা প্রস্তুতি নেন। যদিও এ বছর মাছের সরবরাহ কিছুটা কম, তবুও ক্রেতাদের ভিড় কমেনি। বড় মাছের চাহিদা থাকলেও দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
মেলায় ১০ কেজির বেশি ওজনের মাছ প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ৩/৪ কেজির আশেপাশের রুই-কাতলার দাম ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। আকার ও মানভেদে দাম নির্ধারণ করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
বিক্রেতারা ট্রাক ও পিকআপে করে মাছ এনে ডালায় সাজিয়ে বিক্রি করছেন। কোথাও জীবিত মাছ পানিতে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও ডালায় লাফাতে দেখা যাচ্ছে মাছগুলো—যা মেলার আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
স্থানীয়দের মতে, এই মাছের মেলা শতবর্ষী মাছের মেলা, কুমিল্লার ঐতিহ্যের একটি অংশ। স্থানীয়রা বলেন, শত বছরেরও বেশি আগে এর সূচনা। একসময় শুধু কাতলা মাছের আধিক্য থাকলেও এখন নানা প্রজাতির মাছের সমাহারে মেলাটি আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে।
দাউদকান্দি থেকে আসা বিক্রেতা আফজাল বলেন, গতবারের তুলনায় এবার মাছ কম হলেও ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা বেশি আছে। তার মতে, চাহিদা বেশি থাকলেও মাছের দামে তেমন কোনো বেশি হয়নি।
মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকআপে করে বড় বড় মাছ আনা হচ্ছে। সেগুলো নামিয়ে ডালায় সাজিয়ে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। কোথাও পানির মধ্যে জীবিত মাছ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও ডালায় রাখা মাছ লাফাতে দেখা যাচ্ছে—যা মেলার প্রাণবন্ত পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
দামের দিক থেকে দেখা যায়, ১০ কেজির বেশি ওজনের মাছ প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, আড়াই থেকে ৩ কেজি ওজনের রুই ও কাতলা মাছ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আকার ও গুণগত মান অনুযায়ী দরদাম করছেন ক্রেতারা।
ব্রাহ্মণপাড়ার সাহেবাবাদ থেকে আসা ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন জানান, এবার বড় মাছ তুলনামূলক কম এনেছেন। তার সবচেয়ে বড় কাতলা মাছটির ওজন ছিল সাড়ে ১৩ কেজির মতো, যা তিনি ১৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছেন।
ক্রেতাদের মধ্যেও ছিল উৎসবের আনন্দ। রাজগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা জাহান অপটিক্স এর সত্ত্বাধিকারী হান্নান বলেন, প্রতি বছরই তারা এই মেলার জন্য অপেক্ষা করেন। নতুন বছরের প্রথম দিনে পরিবারের সঙ্গে মাছ কেনার আনন্দটা তার কাছে কোরবানির ঈদের গরু কেনার মতোই আনন্দের।
স্থানীয়দের মতে, এই মাছের মেলা কুমিল্লার শতবর্ষী পুরনো ঐতিহ্যের অংশ। নির্দিষ্টভাবে শুরুর সময় জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, এর বয়স শত বছরেরও বেশি। আগে যেখানে শুধু কাতলা মাছই বেশি দেখা যেত, এখন সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।