প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: জাতীয় | প্রকাশ: 29 Oct 2026, 10:21 AM
চৌদ্দগ্রাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম তালুকদারের ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত
এমরান হোসেন বাপ্পি
আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে গ্রাহকের প্রায় ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতসহ ১৭টি অভিযোগের তদন্তে দায় প্রমাণিত হওয়ার পরও গুরুদণ্ডের পরিবর্তে মাত্র দুই বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংকের গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে গ্রাহকের আমানতের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা আঞ্চলিক সরকার কর্মরত রয়েছেন। তার বাড়ী চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাশিনগর ইউনিয়নের বৈরয়া গ্রামে। ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সরওয়ার আলম তালুকদার ২০১৯ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৯ জুন পর্যন্ত চৌদ্দগ্রাম শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব
পালন করেন। এ সময় গ্রাহকের আমানত আত্মসাত, ঋণের জামানত হিসেবে রাখা চেকে স্বাক্ষর জালিয়াতি, গ্রাহকের নামে ঋণ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নামে ঋণনীতিমালা লঙ্ঘন করে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ তদন্তে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২১ সালের জুন মাসে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। তদন্তের পর সরওয়ার আলম তালুকদারসহ শাখার আরো দুই কর্মকর্তা আবদুল জলিল ও আবুল কালামের বিরুদ্ধে মোট ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২৩৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আবদুর রহিম শিকদারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০০৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ, আত্মসাত, তহবিল তসরুপ ও প্রতারণামূলক অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছিল। তবে তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা, লিখিত জবাব, চাকরির মেয়াদ ও বয়স বিবেচনায় সংশোধনের সুযোগ দিয়ে লঘুদণ্ড হিসেবে ২০২৪ সালের ১ জুলাই ও ২০২৫ সালের ১ জুলাই প্রাপ্য দুই বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিত করা হয়। ১৭টি অভিযোগের মধ্যে জাল স্বাক্ষরে ঋণ উত্তোলনের অভিযোগ
২০২২ সালের ৩ মার্চের অভিযোগনামায় গ্রাহকের আমানত থেকে অর্থ আত্মসাত, জাল স্বাক্ষরে চেক নগদায়ন, গ্রাহকের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, এসডিপিএসের টাকা আত্মসাত এবং ঋণনীতিমালা লঙ্ঘন করে ঋণ দেওয়াসহ ১৯টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ১৭ অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়। অভিযোগনামায় উল্লেখ করা হয়, আমানতকারীদের টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি অধীনস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে জোরপূর্বক চেক গ্রহণ করে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬৬ টাকা উত্তোলন। আমানতকারীদের টাকা প্রতারণা ও জাল/জালিয়াতির মাধ্যমে ৯ লাখ ৮ হাজার ৩’শ টাকা আত্নসাত, দায়িত্বে অবহেলা ও ঋণ নীতিমালা লংঘন। অধিনস্থ কর্মকর্তার নিকট হইতে জোরপূর্বক বঙ্গবন্ধু সঞ্চীয় আমানত
হিসাবের চেক গ্রহণ ও প্রাপকের জাল স্বাক্ষরের চেক নগদায়ন করে ১ লাখ ২০ হাজার ৯’শ ৬৬ টাকা উত্তোলন করে আত্নসাত।গ্রাহ কের নামে ঋণ বিতরণ দেখিয়ে ভূয়া স্বাক্ষরের মাধ্যমে ২ লাখ আত্নসাত।ব্যাং কের ২ জন এসডিপিএস আমানত হিসাবধারীর নামের রশিদ পরিবর্তন করে ২৫ হাজার টাকা আত্নসাত। এসডিপিএস এর স্থিতির বিপরীতে ঋণ পরিশোধের ২ লাখ ৩২ হাজার ৩’শ ৬০ টাকা।
সরওয়ার আলম তালুকদারের স্ত্রী রুনা লায়লার নামে ব্যাংকের ঋণ সার্কুলার লংঘন করে ৬৩ হাজার ৬’শ ৩০ টাকা অতিরিক্ত ঋণ প্রদান।
ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় কর্তৃক নামঞ্জুরকৃত উদ্যোক্তাকে ব্যাংখ বিধিমালা লংঘন করে ১ লাখ ঋণ প্রদান।
প্রতারণার মাধ্যমে নগদ টাকা জমা ব্যতীত শুধুমাত্র ডিপোজিত স্লীপের মাধ্যমে ব্যবস্থাপক শাখার অন্যান্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সঞ্চয়ী আমানত
হিসাবের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলন দেখিয়ে আত্মসাৎ। এসডিপিএস হিসেবে মাসিক জমার টাকা আদায় করে ৪ হাজার টাকা
আত্নসাত। এসডিপিএস হিসাবধারীদের নিকট হইতে মাসিক জমার ৭৯ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে মোট ২৩ লাখ ৯২ হাজার ২’শ ৩৪ টাকা আত্নসাতসহ
১৭টি অভিযোগের চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করা
গ্রাহকের নামে ঋণ দেখিয়ে দুই লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং এসডিপিএস
হিসাবের বিপরীতে ঋণ পরিশোধের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও ছিল। এ
ছাড়া তাঁর স্ত্রী রুনা লায়লার নামে ঋণ সার্কুলার লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ঋণ
প্রদানসহ আরও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়।
নতুন করে আমানতের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ-
চলতি বছরের ২৫ আগস্ট সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে নতুন করে গ্রাহকের
আমানতের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রাহক
পারভীন আক্তারের ৫ হাজার ১৫৬ টাকা ও আরেক গ্রহক পাভীন বেগম এর ৩৮
হাজার ৪০৯ টাকা এবং আবুল খায়েরের ৩২ হাজার ৫১৭ টাকা আত্মসাৎ করা
হয়েছে।
চৌদ্দগ্রাম শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন বলেন, “সরওয়ার আলম
তালুকদার দায়িত্বে থাকাকালে তাঁদের এসডিপিএসের টাকা আত্মসাত করা
হয়েছে—এমন অভিযোগে চারজন গ্রাহক আমার কাছে লিখিত অভিযোগ
দিয়েছেন।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দায় প্রমাণিত হলেও ফেরত পাননি টাকা
ভুক্তভোগী সোহেল আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ
নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে দেওয়া চেক ব্যবহার করে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে
অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যাংকের
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, তদন্তে
অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ওই অতিরিক্ত ঋণের দায় তাঁকেই বহন করতে হচ্ছে।
অভিযোগ করার পর প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথাও জানান তিনি। এ ঘটনায়
তিনি সে সময় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলে জানান।
রহিমা বেগম নামে এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, তিনি ও তাঁর স্বামী
আবদুর রহমান পৃথক হিসাবে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা ঋণ
নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্বাক্ষর জাল করে অতিরিক্ত চার লাখ ৩০ হাজার টাকা
ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয় বলে তাঁর দাবি। ২০২১ সালে অভিযোগ করলেও
তদন্তের ফল সম্পর্কে তাঁরা জানতে পারেননি। ২০২৪ সালের জুনে তাঁর স্বামীর
মৃত্যুর পরও অতিরিক্ত ঋণের দায় তাঁদের পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানান
তিনি।
প্রবাসী শফিউল আজম বলেন, ২০২১ সালে এসডিপিএসের আমানত তুলতে
গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ২৬ হাজার ৫৩৬ টাকা উত্তোলন করা
হয়েছে। অথচ তিনি ওই টাকা পাননি। এ ঘটনায় তৎকালীন ব্যবস্থাপকের
বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেও আমানত ফেরত পাননি বলে দাবি করেন
তিনি।
আবুল খায়ের জানান, ২০২০ সালে এসডিপিএসের বিপরীতে নেওয়া ঋণের ৩০
হাজার টাকা পরিশোধ করলেও চলতি বছরের আগস্টে তিনি জানতে পারেন, তাঁর
নামে ওই ঋণ এখনো বকেয়া রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ
দিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য-
ব্যাংকটির কুমিল্লা অঞ্চলের আবাসিক ব্যবস্থাপক (আরএমও) জামাল উদ্দিন
বলেন, সরওয়ার আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ এখনো
তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন বলেন, “আমি নতুন
এসেছি। খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে পরে বক্তব্য প্রদান করব।”
অন্যদিকে, সরওয়ার আলম তালুকদার তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে ওঠা অভিযোগগুলো
মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। আগের শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে
তিনি আপিল করেছেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, তদন্তের ফলাফল এবং শাস্তির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও
আত্মসাতের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা তাঁদের টাকা ফেরত পাবেন কি
না, তা এখনো অনিশ্চিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ ও
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস...
বেলাল উদ্দিন আহাম্মদ, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লে...
নগরীর চার এলাকায় ৯টি ভবন পরিদর্শন, বিল্ডিং কোড না মেনে নির্ম...
আয়েশা আক্তার।।কুমিল্লা নগরীতে অনুমোদনহীন ও বিল্ডিং কোড না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযান চ...
জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা ব্যক্তিরাই জুলাইকে সবচেয়ে বেশ...
কুবি প্রতিনিধি২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তারাই জুলাইকে সবচেয়ে বে...
চৌদ্দগ্রাম বদরপুরে জনবহুল এলাকায় মোবাইল টাওয়ার নির্মাণের প্র...
ফারুক আজমকুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামে জনবহুল এলাকায় মোবাইল ফো...
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের তান্ডব ও সহিংসতার প্রতিবাদে চৌদ্দগ্র...
এমরান হোসেন বাপ্পি২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় আওয়ামীলীগের লগি-বৈঠা নিয়ে তান্ডব এবং বর্বরতার প্রতিবাদ...
লালমাইয়ে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যুবদল নেতাকর্মীদের...
মাসুদ রানা, কুমিল্লাবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লার লালমাই উপ...