মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। জেলার ১৮ থানায় পুলিশের রাতভর বিশেষ অভিযানে আটক করা হয়েছে ৬২৪ জনকে। তাদের মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর দাউদকান্দিতে আটক কিশোরদের ছাড়িয়ে নিতে একদল কিশোর-তরুণ থানায় ঢুকে ১৭ জনকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় থানায় চেয়ার-টেবিল ভাঙচুরেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত কুমিল্লা নগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বখাটেদের আড্ডাস্থল, অপরাধপ্রবণ এলাকা ও সন্দেহজনক স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে আটক ৬২৪ জনের মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মামলায় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান বলেন, আটক ব্যক্তিদের পূর্বের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে।
দাউদকান্দিতে থানায় ঢুকে ১৭ জনকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ
কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের মধ্যেই দাউদকান্দি মডেল থানায় ঘটে আরেক ঘটনা। বুধবার সন্ধ্যায় থানার উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে অর্ধশত কিশোর ও তরুণকে আটক করা হয়।
পরে একদল কিশোর-তরুণ থানায় ঢুকে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জনকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় থানার চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বহিরাগতদের আচরণ ছিল ভয়াবহ। তারা স্লোগান দিতে দিতে থানায় ঢুকে আটক ব্যক্তিদের নিয়ে যায়।
তবে থানায় হামলা বা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম। এর মধ্যেই থানার ভেতরে হামলা ও ভাঙচুরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নয় মাসে ১০৪ হত্যাকাণ্ডঃ
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের পাশাপাশি কুমিল্লায় সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের নয় মাসে জেলায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ১১টির বেশি হত্যাকাণ্ড।
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। পুলিশ ও বিভিন্ন মামলার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারসহ নানা কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
একদিনে অপরাধী হয়নি তারাঃ
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, শিশু-কিশোর ও তরুণরা একদিনে অপরাধী হয়ে ওঠেনি। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার তুহিন, ফাহাদসহ তিনজনও একদিনে অপরাধে জড়ায়নি। দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও সামাজিক নানা কারণ তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবারের অসচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতাও অপরাধ সংঘটনের একটি কারণ। অপরাধ সংঘটনের পর তৎপরতার চেয়ে অপরাধ যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে আগে থেকেই কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
বদরুল হুদা জেনু আরও বলেন, গত দুই বছরে শিশু-কিশোর ও তরুণদের বেপরোয়া জীবনের যে প্রতিফলন দেখা গেছে, তা উদ্বেগজনক। এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও মূল্যবোধের সংকট দূর করতেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আটক করেও ঠেকানোঃ
যাচ্ছে না অপরাধ
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, গত কয়েক মাসে কিশোর গ্যাংয়ের বিপুলসংখ্যক সদস্যকে আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের অনেকেই কারাগার থেকে বের হয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেককে মা-বাবা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আরও বড় পরিকল্পনা নিয়ে তালিকা তৈরি করে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনীতিবিদদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, দুই হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষের জন্য একজন পুলিশ সদস্য দিয়ে কিশোর গ্যাংসহ কোনো অপরাধ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবার, সমাজ, রাজনীতিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।