স্টাফ কোয়ার্টার
কুমিল্লায় একাধিক মামলা দায়েরের জেরে মামলা প্রত্যাহারে চাপ, অনুসরণ, অপহরণের চেষ্টা, চাঁদা দাবি, প্রাণনাশের হুমকি, ছিনতাই এবং সাইবার হয়রানির অভিযোগ করেছেন জাতীয় অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র। এসব ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে দেওয়া অভিযোগে অজ্ঞাতনামা তিন পুরুষ ও এক নারীসহ আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের অনুলিপি কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেও দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি এসডিআর নং-৬৮৯০, তারিখ ৮ আগস্ট ২০২৬ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র জানান, এর আগে তিনি কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় আরাফাতসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটি ১৪ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে দায়ের করা হয় এবং এতে জখম ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই মামলার পর থেকেই অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি তাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ তার।
লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, অজ্ঞাত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে ছদ্মবেশে নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস নিয়ে তাকে অনুসরণ করতেন এবং তার বাসাবাড়ির আশপাশে অবস্থান নিতেন। ২০২৫ সালের ১১ মে কুমিল্লা আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির কাছে দুই ব্যক্তি নিজেদের প্রশাসনের বিশেষ সংস্থার লোক পরিচয় দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য ভয়ভীতি দেখান এবং তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তিনি চিৎকার করলে কোর্ট পুলিশ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে আসেন। তখন ওই দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে আদালতকে বিষয়টি অবহিত করা হলে ১৩ মে ২০২৫ তারিখের এক আদেশে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর পুরাতন চৌধুরীপাড়া এলাকায় চারজন ব্যক্তি দুটি মোটরসাইকেলে এসে তার পথরোধ করেন বলে দাবি করেন মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র। তার অভিযোগ, তাদের মাথায় হেলমেট ও মুখে কালো মাস্ক ছিল। তারা নিজেদের প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। তিনি রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল ফোন, পেশাগত কাজে ব্যবহৃত ডিজিটাল ক্যামেরা ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জখম অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। পরে তার অভিযোগের ভিত্তিতে কোতয়ালী মডেল থানায় ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে মামলা হয়। অভিযোগপত্রে মামলাটির নম্বর ৫১, জিআর ৮১২ এবং দণ্ডবিধির ৩৯২/৩৪ ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মওদুদ আবদুল্লাহর দাবি, এসব মামলা বিচারাধীন থাকার মধ্যেই তাকে ধারাবাহিকভাবে হুমকি ও হয়রানি করা হচ্ছে। নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি কোতয়ালী মডেল থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগও করেছেন বলে জানান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে তাকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এ সময় সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে মোটরসাইকেলের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়া তার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অশ্লীল ছবি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও করেছেন এই সাংবাদিক। তার নামে ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানো এবং পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।
অভিযোগকারী জানান, এসব ঘটনায় তিনি আদালতে একটি সিআর মামলাও দায়ের করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সিআর মামলা নং-৬১৫/২৬-এ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে এবং মামলাটি আদালতের নির্দেশে কোতয়ালী মডেল থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।
আদালতে যাওয়ার সময়ও অনুসরণের অভিযোগ: অভিযোগে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে ৬ আগস্টের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র।
তার দাবি, ওই দিন সকাল আনুমানিক ১১টা ৩৭ মিনিটে বাসার সামনে থেকে একটি নোহা গাড়িতে থাকা তিন পুরুষ ও এক নারীসহ কয়েকজন তাকে অনুসরণ করে আদালত পর্যন্ত যায়। আদালতের পূর্ব গেটের কাছে তাকে আটক করে গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অভিযুক্তরা নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মওদুদ আবদুল্লাহর ভাষ্য, তিনি ধাক্কা দিয়ে কোনোভাবে তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং চিৎকার করে লোকজনের সহযোগিতা চান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে অভিযুক্তরা নোহা গাড়ি নিয়ে কাপ্তান বাজার সড়ক হয়ে টিক্কারচর সেতুর দিকে চলে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন ৭ আগস্ট ফৌজদারী এলাকায় ফের তাকে একটি সিএনজিতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি তার। অভিযোগে মওদুদ আবদুল্লাহ বলেন, তাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে এবং ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমনকি তার মোবাইল ফোন ও বাসার ছাদের সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়েও হুমকিদাতারা বিভিন্ন কথা বলেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অভিযোগে আরও বলা হয়, ২ আগস্ট ২০২৬ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে পুরাতন চৌধুরীপাড়ায় বাসার সামনে থেকে তার ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ফোনে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টুইটার ও জিমেইলসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট লগইন অবস্থায় ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
এ কারণে মোবাইল ফোনটি উদ্ধারের পাশাপাশি তার ডিজিটাল অ্যাকাউন্টগুলো নিরাপদ করা এবং সম্ভাব্য সাইবার অপরাধের বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মওদুদ আবদুল্লাহর অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে তাকে অনুসরণ করছে এবং তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এমনকি তার পৈত্রিক বসতবাড়ি দখলের জন্যও অতীতে ষড়যন্ত্র ও অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবহিত করেছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছে, তার ব্যক্তিগত মামলার কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নজরদারি করা হচ্ছে না।
সিসিটিভি ও ডিজিটাল আলামত সংরক্ষিত থাকার দাবি: অভিযোগকারী দাবি করেন, তার ওপর সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও স্থিরচিত্র তার মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মাধ্যমে সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আলামতও উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার দাবি, এ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ৩২টি আলামত ও নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব নথি ও আলামত পর্যালোচনা করলে ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে পারে।
ডিবির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন
নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগটির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত, সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিজিটাল আলামত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন তিনি।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, তার পূর্বে দায়ের করা জিআর ও সিআর মামলাগুলোর আসামিদের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর অভিযুক্তদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
তবে অভিযোগে উত্থাপিত এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন; অভিযোগের সত্যতা বা অভিযুক্তদের দায় আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।