প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 4 Nov 2026, 9:50 AM
মেঘনার পাড়ের জেলেদের জীবনচিত্র
কাজী খোরশেদ আলম
নদী আছে, মাছ আছে, জাল আছে, আছে মাছ ধরার অদম্য ইচ্ছা। কিন্তু নেই নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন মেঘনা নদী, অথচ সেই নদীতেই মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা বাধা, নিষেধাজ্ঞা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় জেলেদের। দিনের পর দিন নদীতে মাছ ধরেও অনেকের ভাগ্যে জোটে না দুবেলা দুমুঠো খাবার। সংসারের অভাব, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন তাঁরা। এমনই এক করুণ বাস্তবতার চিত্র দেখা গেল ভোলা জেলার ধনিয়া ইউনিয়নের ইলিশ বাড়ী ও তুলাতুলি মাছঘাট এলাকার মেঘনাপাড়ের জেলেপল্লিতে।
গত ৩ নভেম্বর কুমিল্লা থেকে সাত সদস্যের একটি সংবাদকর্মী দল ভোলার তুলাতুলি মাছঘাট এলাকায় ভ্রমণে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাই। সফর সঙ্গী হিসেবে সাথে ছিলেন আবু বক্কর সিদ্দিক, মনোয়ার হোসেন, গীতিকবি আক্কাস আল মাহমুদ হৃদয়, মোঃ শরীফুল ইসলাম সুমন, ভারতের ত্রিপুরা থেকে আগত মিজানুর রহমান ও ইমরান। তাঁদের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে, জীবনসংগ্রামের গল্প শুনে উপলব্ধি করা গেল—নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করা এই মানুষগুলোর জীবন কতটা কঠিন। বাইরে থেকে নদী, মাছঘাট আর নৌকার দৃশ্য যতটা সুন্দর মনে হয়, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে ততটাই বেদনাদায়ক জীবনকাহিনি।
নদীই যাদের জীবন, নদীই যাদের জীবিকার ঠিকানা-
মেঘনা নদীর বুক চিরে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জেলেরা। কারও কাছে নদী জীবনের স্বপ্ন, কারও কাছে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তাঁদের কর্মব্যস্ততা। কখনো উত্তাল ঢেউ, কখনো বৈরী আবহাওয়া, আবার কখনো নদীর স্রোতের সঙ্গে যুদ্ধ করে মাছ ধরতে হয়। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে যে মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানোই তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু মাছ না পেলে সেদিনের উপার্জনও থাকে না। নৌকা, জাল, তেল ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ মেটানোর পর অনেক সময় হাতে তেমন কিছুই থাকে না। কখনো ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। এভাবেই বছরের পর বছর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন তাঁরা।
জরিমানা ও জাল পোড়ানোর আতঙ্ক অনেক সময় দিন এবং রাত কাটে।
জেলেদের অভিযোগ, নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের অভিযানের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। অনেক সময় জরিমানা, জাল জব্দ কিংবা জাল পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনার কারণে তাঁদের জীবিকা আরও সংকটের মুখে পড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাঁদের মধ্যে রয়েছে নানা ক্ষোভ ও হতাশা।
জেলেদের বক্তব্য, মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে তাঁরা তা মেনে চলতে চান। কারণ নদীর মাছ রক্ষা করা তাঁদের নিজেদের স্বার্থেরও বিষয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থান ও পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকলে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাঁদের একমাত্র উপার্জনের পথ নদীতে মাছ ধরা, তাঁদের কাছে প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার দিন মানে নতুন করে অভাবের মুখোমুখি হওয়া।
ছোট জেলেদের জন্য কঠোরতা, বড়দের জন্য সুযোগের অভিযোগ করেছে স্থানীয় অনেক নিরিহ জেলে।
জেলেদের মুখে শোনা গেল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ। তাঁদের দাবি, ছোট ও অসহায় জেলেদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে কঠোরতা দেখা গেলেও প্রভাবশালী ও বড় জেলেদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা সব সময় নেওয়া হয় না। ছোট জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ করে দেওয়া হলেও বড় জেলেদের কেউ কেউ নানা সুযোগ-সুবিধা পান বলে তাঁদের অভিযোগ।
এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। নদী রক্ষার নামে যেন প্রকৃত দরিদ্র জেলেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
জেলে কার্ড নেই, সরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত থাকার কথাও তারা জানায়। জেলেদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র। তাঁদের অভিযোগ, অনেক প্রকৃত জেলের জেলে কার্ড নেই। ফলে সরকারি সহায়তা, বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞাকালীন খাদ্যসহায়তা কিংবা অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা সমস্যায় পড়েন।
যাঁরা বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তাঁদের অনেকের নাম সরকারি তালিকায় না থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা তৈরি, বাদ পড়াদের নিবন্ধন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি সহায়তা বিতরণ এখন সময়ের দাবি।
জেলেপল্লির শিশুদের ভবিষ্যৎ কি অন্ধকারে?
সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয় হলো, জেলেদের দারিদ্র্যের প্রভাব পড়ছে তাঁদের সন্তানদের ওপর। সংসারে আয় কম থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করতে পারেন না। বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। ফলে অনেক শিশুর নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন জেলের সন্তানও চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা দেশের একজন যোগ্য নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সুযোগ ও পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তা। অথচ নদীর পাড়ের এই পরিবারগুলোর কাছে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যখন কঠিন, তখন সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অনেক সময় অধরাই থেকে যায়।
একটি শিশুর শিক্ষাজীবন যেন শুধু তার বাবার পেশাগত পরিচয়ের কারণে থেমে না যায়। এ জন্য জেলেপল্লির দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তুলাতুলি মাছঘাটের কান্না কি পৌঁছাবে নীতিনির্ধারকদের কাছে? তুলাতুলি মাছঘাট শুধু মাছ কেনাবেচার একটি স্থান নয়; এটি অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার কেন্দ্র। এখানকার জেলে, শ্রমিক, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার ও তাঁদের পরিবারের জীবন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নদীতে মাছ পাওয়া না গেলে শুধু জেলে নয়, পুরো মাছঘাটের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়ে।
আমরা কুমিল্লা থেকে আসা সাতজন সংবাদকর্মী যখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন উপলব্ধি করেছি—একটি নদীকে ঘিরে কত মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার গল্প লুকিয়ে আছে। তাঁদের অভাবের কথা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং জীবিকা হারানোর ভয় শুনে মনে হয়েছে, দেশের উন্নয়নের আলো এখনো সব মানুষের ঘরে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
জেলেদের দাবি ও অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করতে হবে, জেলে কার্ড নিশ্চিত করতে হবে, নিষেধাজ্ঞাকালীন খাদ্যসহায়তা যথাসময়ে পৌঁছে দিতে হবে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের অভিযান যেন আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মেঘনা নদী দেশের সম্পদ। এই নদীর মাছ রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জেলেরা নদীকে ভালোবাসেন, নদীর সঙ্গে তাঁদের জীবন জড়িয়ে আছে। তাঁরা নদী ধ্বংস করতে চান না; চান সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে, সন্তানদের লেখাপড়া করাতে এবং পরিবার নিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে শান্তিতে জীবন কাটাতে।
তুলাতুলি মাছঘাটের জেলেদের চোখের জল শুধু কয়েকটি পরিবারের ব্যক্তিগত দুঃখ নয়; এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি একটি মানবিক প্রশ্ন। যারা দেশের মানুষের পাতে ইলিশসহ নানা ধরনের মাছ তুলে দিতে দিনরাত নদীতে পরিশ্রম করেন, তাঁদের ঘরেই কেন এত অভাব থাকবে?
আমরা চাই, মেঘনার ঢেউয়ের সঙ্গে জেলেদের জীবনে সুখের ঢেউও ফিরে আসুক। তাঁদের সন্তানদের হাতে জালের পরিবর্তে শিক্ষার আলোয় গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হোক। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে আসুক। কারণ জেলেদের বাঁচিয়ে রেখেই বাঁচাতে হবে নদী, মাছ ও দেশের মৎস্যসম্পদ।
তুলাতুলি মাছঘাটের জেলেদের কান্না যেন আর উপেক্ষিত না থাকে।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
লালমাইয়ে জাতীয় যুব দিবস পালিত
মাসুদ রানা "দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কুমিল্লার লালমাই...
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে...
আবুল কালাম আজাদ, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে "পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক" মনোহরগঞ্জ শাখার উদ্যোগে বাৎসরিক...
প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল রেলে বাঁশকাইটে স্টেশন স্থাপন...
বেলাল উদ্দিন আহাম্মদ , মুরাদনগর প্রস্তাবিত ঢাকা–চট্টগ্রাম নতুন এলিভেটেড (উড়াল) রেললাইন প্রকল্...
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের ‘প্রতিভা’ স্কুলের প্রতিষ্ঠাবার্...
বেলাল উদ্দিন আহাম্মদ, মুরাদনগরকুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী...
কুমিল্লায় হবে জাতী সংঘের অধিবেশন
মাহফুজ নান্টু কুমিল্লা।জাতী সংঘের আদলে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হবে জাতীসংঘ অধিবেশন। আন্তর্জাতিক কূটন...
বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়ায় মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের ঠাঁই হবে না...
মো. আনোয়ারুল ইসলাম।।কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিন জসিম বলেছেন,...