প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 30 Sep 2026, 9:36 AM
নোটিশের পরও নির্মাণকাজ—আল-আমিন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন
আয়েশা আক্তার
কুমিল্লা নগরীর নানুয়াদিঘির পাড়ে সিটি করপোরেশনের নকশা অনুমোদন ছাড়াই ৯ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে আল-আমিন হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপার্সের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, নির্মাণকাজ বন্ধে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পরপর দুই দফা নোটিশ দেওয়ার পরও ভবনটির নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—নকশার অনুমোদন এখনো না পেলেও ভবনটির ফ্ল্যাট ২০২৬ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে ক্রেতাদের কাছে হস্তান্তরের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদন ছাড়াই কীভাবে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং কোন ভিত্তিতে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়সীমা ঘোষণা করা হচ্ছে?
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে নানুয়াদিঘির পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, 'চৌধুরী ভবন’ নামের ৯ তলা ভবনটির নির্মাণকাজ বেশ এগিয়ে গেছে। অথচ ভবনটির নকশা অনুমোদনের কোনো অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
ফ্ল্যাট ক্রেতা হিসেবে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় বিভাগের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হবে বলে জানান। কিন্তু নকশার অনুমোদন না থাকলে সেই হস্তান্তরের আইনগত ভিত্তি কী—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
নোটিশ একের পর এক, কাজ বন্ধ কোথায়?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আল-আমিন হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপার্স ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর সিটি করপোরেশন থেকে নকশা অনুমোদনের আবেদনপত্র সংগ্রহ করে। পরে ২০২৫ সালের ২৫ জুন আবেদন জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এর আগেই ২০২৪ সালের ৩ জুন অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দিয়েছিল কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। এরপরও নির্মাণকাজ চলতে থাকায় ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই দ্বিতীয় দফায় নির্মাণকাজ বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়।
প্রথম নোটিশে নগরীর বিভিন্ন স্থানে নকশা অনুমোদন ছাড়াই তিনটি বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ তোলা হয়। পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ইট, বালু, খোয়া ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী রাখায় পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন এবং পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরির কথাও উল্লেখ করা হয়।
প্রশ্ন হলো—একবার নয়,পরপর দুইবার নোটিশ দেওয়ার পরও যদি নির্মাণকাজ বন্ধ না হয়, তাহলে সিটি করপোরেশনের নির্দেশের কার্যকারিতা কোথায়?
‘জরিমানা দিলেই সমাধান’—কতটা যুক্তিসংগত?
প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহির হোসেন বলেন, জরিমানা দেওয়ার মাধ্যমে বন্ধের নোটিশের বিষয়টির সমাধান করা যায় বলে জানান। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁদের একটি প্রকল্প পরিদর্শন করে সবকিছু ঠিক পেয়েছে। তবে নানুয়াদিঘির পাড়ের ‘চৌধুরী ভবন’ প্রকল্পটি কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করেছে কি না—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মাওলানা মো. জসিম উদ্দিনকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনটি কেটে দেন। জানা যায় নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করলেও এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি। নির্মাণ কর্মীদের ভাষ্য, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে এবং জমির মালিকেরা দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
কিন্তু অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা কোথায়—সে প্রশ্নের জবাবে তার কাছ থেকে কোন উত্তর পাওয়া যায় নি।
কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য, এরপর কী?
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, অনুমোদন ছাড়া নির্মাণকাজের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে পরপর দুইবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবু সায়েম ভূইয়া বলেন, দুই দফা নোটিশের পরও নির্মাণকাজ চলায় প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবনটির বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—চূড়ান্ত নোটিশের আগ পর্যন্ত কি নির্মাণকাজ চলতেই থাকবে?
৯ তলা ভবন উঠে গেল, তদারকি ছিল কোথায়?
নকশা অনুমোদনের আবেদনই যদি ২০২৫ সালের জুনে জমা পড়ে এবং এখনো অনুমোদন না হয়, তাহলে এরই মধ্যে ভবনটির নির্মাণকাজ এতদূর এগিয়ে গেল কীভাবে?
আর যদি সিটি করপোরেশন আগেই অনুমোদনহীন নির্মাণের বিষয়টি শনাক্ত করে দুই দফা নোটিশ দিয়ে থাকে, তাহলে সেই নোটিশ অমান্য করে দিনের পর দিন নির্মাণকাজ চালানোর সুযোগই বা কীভাবে তৈরি হলো?এ ঘটনায় শুধু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নগর পরিকল্পনায় বড় ঝুঁকি বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদনের পাশাপাশি রাস্তার প্রস্থ, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, আলো-বাতাস, ভবনের ব্যবহার এবং আশপাশের অবকাঠামোর সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। এসব শর্ত উপেক্ষা করে অনুমোদনবিহীন নির্মাণ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নগরবাসীকেই এর খেসারত দিতে হতে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই—নকশা অনুমোদন নেই, দুই দফা নির্মাণ বন্ধের নোটিশ রয়েছে, এরপরও ৯ তলা ভবনের কাজ চলছে—তাহলে প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করার এমন দুঃসাহসের পেছনে দায় কার?
আল-আমিন হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপার্সের ‘চৌধুরী ভবন’ প্রকল্পের অনুমোদন, নকশা, নির্মাণের প্রতিটি ধাপ এবং নোটিশের পরও কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ...
মোঃ মাসুদ রানা , কুমিল্লা কলাম... দেয়ালে দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম। পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ কিশোরদের আনাগ...
কুমিল্লা ওয়াসার কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা উন্নয়ন নিয়ে সিটি প্র...
আয়েশা আক্তারকুমিল্লা নগরীর নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল করা...
চার শতাব্দীর সাক্ষী খেরুয়া মসজিদ
মো: আজিজুল হক বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলা সদরের খোন্দকার টোলা মহল...
বিএনপির এমপির স্বাক্ষরে অনুমোদন পেল কুমিল্লার লাকসাম প্রেস ক...
কুমিল্লা ব্যুরো চিফ.কুমিল্লার লাকসাম প্রেস ক্লাবের কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন বিএনপির কুমিল্লা-৯ আসনের স...
হাসপাতালের ছাদের পলেস্তারা খসে ৩ রোগী আহত
কাজী নজরুল ইসলাম হাসপাতালের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে হাসপাতালের ভর্তিকৃত তিন জন রোগী...
লালমাইয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স...
মাসুদ রানা, কুমিল্লা:কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের অংশগ্র...