প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: জাতীয় | প্রকাশ: 30 Sep 2026, 9:32 AM
চার শতাব্দীর সাক্ষী খেরুয়া মসজিদ
মো: আজিজুল হক
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলা সদরের খোন্দকার টোলা মহল্লায় দাঁড়িয়ে আছে খেরুয়া মসজিদ। চার শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা এই স্থাপনা বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। লাল ইটের গাঁথুনি, তিনটি গম্বুজ, চার কোণের সুউচ্চ মিনার এবং সূক্ষ্ম অলংকরণে মসজিদটি আজও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। মসজিদের সামনের দেয়ালে উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৫৮২ সালে জওহর আলী কাকশালের পুত্র মির্জা মুরাদ খান কাকশাল এটি নির্মাণ করেন। সে সময় শেরপুর ছিল ঘোড়াঘাট অঞ্চলের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। ঐতিহাসিকদের ধারণা, মির্জা মুরাদ খান শেরপুরের জায়গিরদার অথবা ফৌজদার ছিলেন।
স্থাপত্যে সুলতানি-মোগল মেলবন্ধন
খেরুয়া মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর স্থাপত্যরীতি। মসজিদের নিচের অংশের ভূমি পরিকল্পনায় মোগল স্থাপত্যের প্রভাব থাকলেও ওপরের অংশে মুঘল-পূর্ব সুলতানি আমলের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। ফলে স্থাপনাটিতে বাংলার দুই ঐতিহাসিক স্থাপত্যধারার একটি আকর্ষণীয় সমন্বয় দেখা যায়। মসজিদের দেয়াল চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা পাতলা লাল ইটে নির্মিত এবং প্রায় ১ দশমিক ৮১ মিটার পুরু। উত্তর-দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ দশমিক ২৭ মিটার এবং প্রস্থ ৭ দশমিক ৪২ মিটার। পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, মাঝেরটি তুলনামূলক বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালেও রয়েছে একটি করে খিলান দরজা। পশ্চিম দেয়ালের ভেতরের অংশে তিনটি মেহরাব রয়েছে। মেহরাবের ওপরের কারুকাজ এবং সামনের দেয়ালে ফুল, লতা ও পাতার নকশা এখনো স্থাপনাটির সৌন্দর্য প্রকাশ করে। সময়ের ক্ষয়ে অনেক অলংকরণ ম্লান হলেও ইটের বৈচিত্র্যময় বিন্যাস ও নির্মাণশৈলী এখনো নজর কেড়ে নেয়।
ছাদের ওপর রয়েছে তিনটি অর্ধগোলাকার গম্বুজ। চার কোণে দেয়াল থেকে কিছুটা সামনে বেরিয়ে আছে চারটি বিশাল মিনার। বাঁকানো কার্নিশ ও খিলান আকৃতির প্যানেলের অলংকরণ মসজিদের স্থাপত্যে স্বাতন্ত্র্য যোগ করেছে।
সবুজের মধ্যে ইতিহাস
স্থাপত্যের পাশাপাশি খেরুয়া মসজিদের পরিবেশও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা আয়তাকার মাঠ। চারপাশে তাল, নারকেল, আম ও কদমগাছের সারি। মৌসুমি ফুলের গাছও রয়েছে চত্বরে। ইটের প্রাচীরের ওপর লোহার রেলিং দিয়ে পুরো এলাকা ঘেরা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে মসজিদের পরিবেশ বেশ পরিচ্ছন্ন ও নিরিবিলি। প্রাচীন এই মসজিদে এখনো নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। ফলে এটি শুধু প্রত্নসম্পদ নয়, বর্তমান মানুষের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গেও যুক্ত একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। চার শতাব্দীর বেশি সময়ে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও অবহেলার নানা চিহ্ন পড়েছে মসজিদের গায়ে। ক্ষয়ে গেছে অনেক ইটের অলংকরণ। ঝরে পড়েছে চুন-সুরকির প্রলেপ। তবু স্থাপনাটি এখনো তার ঐতিহাসিক সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। খেরুয়া মসজিদ তাই কেবল একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়। এটি বাংলার স্থাপত্যের বিবর্তন, কারিগরি দক্ষতা এবং অতীতের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। শেরপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই তিন গম্বুজের মসজিদ আজও নীরবে মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, আমাদের চারপাশের ইট-পাথরের স্থাপনাতেও জীবন্ত হয়ে থাকে।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে বাসে ঢাকাুবগুড়া মহাসড়ক হয়ে শেরপুর উপজেলা সদরে নামতে হবে। শেরপুর সদর থেকে খেরুয়া মসজিদ প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে। শেরপুর থেকে রিকশা, ভ্যান বা সিএনজিতে খন্দকার টোলা হয়ে সহজেই মসজিদে যাওয়া যায়।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ...
মোঃ মাসুদ রানা , কুমিল্লা কলাম... দেয়ালে দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম। পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধ কিশোরদের আনাগ...
নোটিশের পরও নির্মাণকাজ—আল-আমিন হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন
আয়েশা আক্তারকুমিল্লা নগরীর নানুয়াদিঘির পাড়ে সিটি করপোরেশনের নকশা অনুমোদন ছাড়াই ৯ তলা ভবন নির্মাণের অ...
কুমিল্লা ওয়াসার কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা উন্নয়ন নিয়ে সিটি প্র...
আয়েশা আক্তারকুমিল্লা নগরীর নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতিশীল করা...
বিএনপির এমপির স্বাক্ষরে অনুমোদন পেল কুমিল্লার লাকসাম প্রেস ক...
কুমিল্লা ব্যুরো চিফ.কুমিল্লার লাকসাম প্রেস ক্লাবের কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন বিএনপির কুমিল্লা-৯ আসনের স...
হাসপাতালের ছাদের পলেস্তারা খসে ৩ রোগী আহত
কাজী নজরুল ইসলাম হাসপাতালের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে হাসপাতালের ভর্তিকৃত তিন জন রোগী...
লালমাইয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স...
মাসুদ রানা, কুমিল্লা:কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের অংশগ্র...