-মো. মিজানুর রহমান তালুকদার,
অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী সমাজ সেবা অফিসার।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি-সেকান্দর মাস্টার স্মৃতিপাঠাগার ও সমাজ কল্যাণ পরিষদ।
-বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকা—দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন এই মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে। সময়ের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যাও। আর এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজটের দুর্ভোগ।
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। কোথাও সামান্য দুর্ঘটনা, কোথাও সড়কের সংস্কারকাজ, আবার কোথাও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ—যে কোনো একটি কারণেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে জরুরি সেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষকে।
একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে যখন চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর কিংবা দেশের অন্য কোনো অঞ্চল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করা হয়, তখন প্রতিটি মিনিটই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), বারডেমসহ রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে দ্রুত পৌঁছানো অনেক রোগীর জন্য জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু পথের দীর্ঘ যানজট কখনো কখনো সেই জীবনরক্ষাকারী যাত্রাকেই অনিশ্চিত করে তোলে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে একজন রোগী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, স্বজনেরা উৎকণ্ঠায় ছটফট করছেন—অথচ সামনে সারি সারি যানবাহন। চালক হর্ন বাজিয়েও পথ তৈরি করতে পারছেন না। এ দৃশ্য শুধু অসহায়ত্বের নয়; এটি আমাদের সড়কব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি।
শুধু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স নয়, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। কোথাও অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যত দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে, তত দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু যানজটে আটকে থাকা একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির প্রতিটি মিনিটের বিলম্ব কখনো কখনো একটি বাড়ি, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বহু মানুষের জীবন ও সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার যানবাহনের ক্ষেত্রেও দ্রুত চলাচলের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ মহাসড়কের যানজটের কারণে এসব জরুরি যানবাহনও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
এই বাস্তবতায় সময় এসেছে আমাদের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার।
আমার প্রস্তাব—ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ অংশগুলোতে জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য পৃথক ‘ইমার্জেন্সি লেন’ চালু করা হোক।
মহাসড়কের এক পাশে যথাযথ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে ডিভাইডার বা উপযুক্ত সড়ক-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অংশ জরুরি যানবাহনের জন্য সংরক্ষিত রাখা যেতে পারে। এই লেনে সাধারণ কোনো যানবাহন চলাচল করবে না। কেবল অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য অনুমোদিত জরুরি সেবার যানবাহন প্রয়োজনের সময় চলাচল করবে।
প্রয়োজনে এই লেনে আধুনিক ক্যামেরা, সিসিটিভি ও ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আইন অমান্য করে কোনো সাধারণ যানবাহন এই লেনে প্রবেশ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্পষ্ট সাইনবোর্ড ও সড়কচিহ্ন দিয়ে চালকদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই জরুরি সেবার যানবাহনের দ্রুত চলাচলের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দেশেও ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো জাতীয় অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বাস্তবতার আলোকে এমন ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অবশ্যই এর জন্য প্রয়োজন হবে সুষ্ঠু পরিকল্পনা, প্রকৌশলগত সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত। পুরো মহাসড়কজুড়ে একই পদ্ধতি প্রয়োগের পরিবর্তে প্রথমে সবচেয়ে বেশি যানজটপ্রবণ ও দুর্ঘটনাপ্রবণ অংশগুলো চিহ্নিত করে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ইমার্জেন্সি লেন’ চালু করা যেতে পারে। ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে তা অন্যান্য অংশে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
আমরা উন্নত সড়ক চাই, দ্রুত যোগাযোগ চাই, অর্থনৈতিক অগ্রগতি চাই—কিন্তু সর্বাগ্রে চাই মানুষের জীবন রক্ষা। একটি অ্যাম্বুলেন্সের সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো মানে একটি প্রাণ বেঁচে যেতে পারে। একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছানো মানে রক্ষা পেতে পারে কোটি টাকার সম্পদ, এমনকি বহু মানুষের জীবন।
তাই ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজটকে শুধু যাতায়াতের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত একটি জাতীয় সমস্যা।
বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি জনস্বার্থে বিনীত আহ্বান—ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য পৃথক লেন চালুর সম্ভাব্যতা জরুরি ভিত্তিতে যাচাই করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
আজ যে অ্যাম্বুলেন্সটি যানজটে আটকে আছে, তার ভেতরে হয়তো একজন মানুষের শেষ আশাটুকু বেঁচে আছে। সেই আশাটুকু যেন যানজটের কাছে পরাজিত না হয়—এটাই হোক আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার অন্যতম অঙ্গীকার।
জীবন বাঁচানোর জন্য পথ চাই—যানজট নয়, জরুরি সেবার জন্য চাই নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের নিশ্চয়তা।
নিচে যানজটপূর্ণ একটি রাস্তার পাশাপাশি এক সাইডে ডিভাইডার দিয়ে জরুরী সেবার গাড়িগুলো চলাচলের জন্য আরেকটি চিকন যানজট মুক্ত রাস্তার চিত্র তুলে ধরা হলো।