ফয়সল আহমেদ খান, বাঞ্ছারামপুর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নের ১১টি ইউনিয়নে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে সেবার গতি কমে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার সাড়ে ৩ লাখ সাধারণ মানুষ।
৫ আগষ্টের পর বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের মধ্যে ১১জন পালিয়ে যান বা ইস্তফা দেন।
শুধু আইয়ুবপুর ও ছয়ফুল্লাকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স্বপদে বহাল আছেন।বাকী ১১ টি ইউনিয়নের দায়িত্বে আছেন প্যানেল চেয়ারম্যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে
অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত প্যানেল চেয়ারম্যান বা সদস্যকে (মেম্বার) না পেয়ে নাগরিকদের ফিরে যেতে হচ্ছে। ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রসহ প্রয়োজনীয় সেবা পেতে একাধিকবার পরিষদে যেতে হচ্ছে অনেককে। কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অভাবে কার্যকরভাবে সেবা মিলছে না।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় সবাই ব্যস্ত আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত ও মাঠ দখলের প্রস্তুতি নিয়ে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়ন পরিষদে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে পরিষদের কার্যক্রম চালু থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, জবাবদিহি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক ব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। স্থানীয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির প্রত্যাশা থাকলেও সব ইউনিয়নে এ কার্যক্রম সচল নেই।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের পুরো ১২ মাস এবং চলতি বছরের বছরের আগষ্ট নিয়ে মোট ১৯ মাসে এ সক্রিয় গ্রাম আদালতগুলোতে মোট ৩৪৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে । এর মধ্যে আগ ইউনিয়ন পরিষদে এসব মামলার মধ্যে ৩০১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। আর নিষ্পত্তি হয়নি ৪২টি মামলা।
জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, গ্রাম আদালতের মামলা নিষ্পত্তির হিসাব দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সামগ্রিক সেবার চিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ গ্রাম আদালতের বাইরে ইউনিয়ন পরিষদের দৈনন্দিন বিভিন্ন সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অনুপস্থিতিতে অনেকেই পরিষদে গিয়ে আগের মতো সহজে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কথা বলা, বিরোধ মীমাংসা কিংবা বিভিন্ন প্রত্যয়ন ও সনদের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খোঁজে একাধিকবার পরিষদে যেতে হচ্ছে। ফলে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে।
পাহাড়িয়াকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা কামাল আহমেদ বলেন, আগে ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পাওয়া যেত। কোনো সমস্যা হলে কথা বলা যেত। এখন অনেক ক্ষেত্রে কার কাছে গেলে সমাধান হবে, সেটাই বুঝতে পারি না। প্যানেল চেয়ারম্যান বিতর্কিত হওয়ার আশংকায় সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেন।
রুপসদী ইউনিয়নের বাসিন্দা গৃহবধূ তানিয়া আক্তার বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গিয়ে আদালতে মামলা করা গ্রামের মানুষের জন্য সহজ নয়। যাতায়াত, আইনজীবী ও অন্যান্য খরচ আছে। গ্রাম আদালত ঠিকভাবে কাজ করলে এসব ঝামেলা অনেক কমে।সম্প্রতি আমাকে কয়েকবার জেলায় মামলার কাজে যেতে হয়েছে।
তবে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। চেয়ারম্যান না থাকলে ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো আল এমরান খান বলেন, "চেয়ারম্যান না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমে বিভিন্ন নাগরিক সেবা এবং গ্রাম আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও অধিকাংশ ইউনিয়নে আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে।"
গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের অন্যান্য সেবাও স্বাভাবিক করতে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার দাবি করেন এলাকাবাসী।