আয়েশা আক্তার
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের জন্য প্রায় অভিন্ন আচরণবিধি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন বিধিমালায় নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত আকার ও সংখ্যায় ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরে পৃথক পৃ
থক আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ করা হয়।
দীর্ঘ এক দশক দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর এবার নির্দলীয় প্রতীকে এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের জন্য নতুন করে এ বিধিমালা জারি করা হয়েছে।
পোস্টার নিষিদ্ধ, বিলবোর্ডেও সীমা
নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। তবে ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকছে। এসব প্রচারসামগ্রীর আকারও নির্ধারণ করে দিয়েছে ইসি।
ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট × ৪ ফুট।
লিফলেট ও হ্যান্ডবিল এ-ফোর আকারের হতে হবে—৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি × ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চি।
ফেস্টুনের সর্বোচ্চ আকার ১৮ ইঞ্চি × ২৪ ইঞ্চি।
বিলবোর্ডের প্রচার অংশের সর্বোচ্চ আকার ১৬ ফুট × ৯ ফুট।
সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌর ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রচারসামগ্রী সাদা-কালো হতে হবে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিনের আবরণ বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি প্রতিটি প্রচারসামগ্রীতে মুদ্রণের তারিখ উল্লেখ করতে হবে।
প্রচারে ব্যবহৃত প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হতে পারবে না। জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার করেও প্রচার চালানো যাবে না।
মাইক ও ক্যারাভানে প্রচারে সময় বেঁধে দিল ইসি নির্বাচনী প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। একই সময়ে একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
এই সময়সীমার মধ্যেই ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহার করে প্রচার চালানো যাবে। তবে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো গেলেও এর পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে দেখাতে হবে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি কিংবা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ভোটারের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধ প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ভোটার কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না।
একইভাবে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের এনআইডি ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচন কমিশন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধিতেই বিষয়গুলো সরাসরি নিষিদ্ধ করা হলো।
প্রচারে থাকবেন না ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ তালিকায় প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদার ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি মেয়রের পাশাপাশি মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রশাসকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক কিংবা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
আচরণবিধি ভাঙলে জেল-জরিমানা, বাতিল হতে পারে প্রার্থিতাও নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান বহাল রয়েছে।
অর্থাৎ, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারে শুধু প্রার্থীর প্রচারসামগ্রী ও মাইক ব্যবহারের ওপরই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এআই-নির্ভর কনটেন্ট, ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রচারে অংশগ্রহণের ওপরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন।