আয়েশা আক্তার
কুমিল্লায় কুটির শিল্প ও বাণিজ্য মেলার নামে জমে উঠেছে র্যাফেল ড্রর কথিত ‘লটারির খেলা’। মাত্র ২০ টাকার টিকিটে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, ল্যাপটপ, সোনার চেইনসহ নানা আকর্ষণীয় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মেলার প্রবেশপথে বিক্রি হচ্ছে পাঁচ রঙের র্যাফেল ড্রর টিকিট। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ড্র। পুরস্কারের আশায় প্রতিদিন টিকিট কিনছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা।
অভিযোগ রয়েছে, একবার টিকিট কিনে পুরস্কার না পেলেও পরেরবার হয়তো লাগবে, এই আশায় অনেকেই বারবার টিকিট কিনছেন। ফলে লটারির প্রতি এক ধরনের আসক্তি তৈরি হচ্ছে।
২০ টাকার টিকিটে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য!
টিকিট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মেলায় প্রায় ৩০ জন কর্মী টিকিট বিক্রির কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রত্যেককে দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা হাজিরা দেওয়া হয়। ওই কর্মীর দাবি, একজন বিক্রেতা প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টিকিট বিক্রি করেন। সে হিসাবে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা। তবে টিকিট বিক্রির প্রকৃত পরিমাণ, আয়-ব্যয়ের হিসাব কিংবা পুরস্কার বিতরণের স্বচ্ছতা নিয়ে মেলা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একেকজন কিনছেন শতাধিক টিকিট
মেলায় নিয়মিত যাতায়াতকারী অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ কেউ একদিনেই ১০/১৫/২০ বার প্রবেশ করে এভাবে ১৫০টি পর্যন্ত টিকিট কিনছেন। ২০ টাকা দামের প্রতিটি টিকিট হলেও একদিনে একজনের পকেট থেকে ৫০০/৭০০ টাকা পর্যন্ত চলে যাচ্ছে।
রিকশাচালক খালেক বলেন, প্রতিদিন টিকিট কিনে মেলায় ঢুকি। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টিকিট কিনছি। কিন্তু একটি পুরস্কারও পাইনি। তারপরও মোটরসাইকেল আর সোনার চেইনের লোভ ছাড়তে পারছি না।
আইসক্রিম বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন টিকিট কিনছি। এখনো কোনো লটারি লাগেনি। কিন্তু নেশার মতো হয়ে গেছে। মনে হয় আজ না হয় কাল কিছু একটা পাব।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়াচ্ছে লটারির নেশা
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সী তরুণদের মধ্যেও র্যাফেল ড্রর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ড্র দেখার জন্য অনেকেই মোবাইল ফোনের সামনে বসে থাকছেন।
অভিভাবকদের আশঙ্কা, পুরস্কারের লোভে এই ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহজে টাকা পাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারে। এতে পড়াশোনায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলাফল প্রকাশ, পুরস্কার ৩৩টি
গত ৩০ আগস্ট মেলা কর্তৃপক্ষ ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রবেশ টিকিটের ওপর অনুষ্ঠিত লটারির ফলাফল প্রকাশ করেছে। সেখানে মোট ৩৩টি পুরস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুরস্কারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান সামগ্রী রয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—একটি বাণিজ্য মেলায় র্যাফেল ড্রর নামে টিকিট বিক্রির অনুমতি কে দিয়েছে? এর আয় কোথায় যাচ্ছে? পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকা ও পুরস্কার বিতরণের নামে চলছে প্রতারণা। অনুমতি নেই, তবুও মেলা কীভাবে চলছে?
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে মেলার অনুমোদন নিয়ে। কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, এই মেলার অনুমতি আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, র্যাফেল ড্রর নামে টিকিট বিক্রির বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত রয়েছি। র্যাফেল ড্র অনৈতিক ও অন্যায্য। কেউ লিখিত অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুমোদন না থাকার কথা বলা হলেও প্রকাশ্যে মেলা এবং র্যাফেল ড্র কার্যক্রম কীভাবে চলছে—এ প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন: গণমাধ্যমের একাধিক কর্মী বলেন, মেলায় অনুমতি না নিয়েই প্রকাশ্যে লটারির নামে জুয়া চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিরাতে লাইভ সম্প্রচারে ড্র হচ্ছে। অথচ প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেবো, মেলার বাইরে লটারির নামে টিকিট বিক্রি হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
র্যাফেল ড্রর দায়িত্বে থাকা বিল্লাল এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেলায় যাওয়ার পথেও আতঙ্ক: এদিকে মেলায় যাওয়ার পথে ভাঙা বিল্ডিং এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগও উঠেছে। সদর দক্ষিণ উপজেলার কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সন্ধ্যার পর ওই সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
একদিকে অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে র্যাফেল ড্রর নামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ এবং মেলায় যাওয়ার পথে ছিনতাইয়ের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে কুমিল্লার এই বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই মেলার নেপথ্যে কারা? সচেতন মহলের প্রশ্ন, জেলা প্রশাসন যদি বলে থাকে মেলার অনুমোদন তারা দেয়নি, তাহলে কার অনুমতিতে মেলা চলছে? কার অনুমতিতে র্যাফেল ড্রর নামে প্রতিদিন টিকিট বিক্রি হচ্ছে? কোটি টাকার এই সম্ভাব্য লেনদেনের হিসাবই বা কোথায়?
সাধারণ ব্যবসায়িদের দাবি, র্যাফেল ড্রর নামে টিকিট বিক্রির বৈধতা, মেলার অনুমোদন, টিকিট বিক্রির অর্থ, পুরস্কার বিতরণ এবং সংশ্লিষ্টদের আর্থিক লেনদেন—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনা হোক।
পুরস্কারের চকচকে বিজ্ঞাপনের আড়ালে যদি সত্যিই সাধারণ মানুষের পকেট কাটার আয়োজন চলে থাকে, তাহলে সেটি বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা
কুমিল্লাবাসীর একটাই প্রশ্ন—মেলা যদি অনুমোদনহীন হয়, তাহলে এতদিন ধরে প্রকাশ্যে এই আয়োজন চলছে কীভাবে?