আয়েশা আক্তার
কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইন মোড়ের আজিজ ফয়জুন্নেছা টাওয়ারে মালিকানা ও ভবন ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ এখন চরমে উঠেছে। টাওয়ারের পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, অ্যাডভোকেট সোয়েবুর রহমান সোয়েবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি, ভবনের ছাদ ও আন্ডারগ্রাউন্ড দখল, পার্কিং স্পেস নিয়ন্ত্রণ, অনুমতি ছাড়া স্থাপনা ও কক্ষ ভাড়া, মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসা এবং নারী-শিশুসহ বাসিন্দাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) টাওয়ার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল আলম চৌধুরী কোতয়ালী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, ভবনের কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিকের কাছে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়েছে। টাকা না দিলে চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, লিফট ও সিঁড়ি ব্যবহারে বাধা এবং আন্ডারগ্রাউন্ড ও ছাদে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মাদক ও বহিরাগতদের আনাগোনার বিষয়টি। তাদের দাবি, ভবনের বিভিন্ন স্থানে বহিরাগতদের নিয়ে মাদক সেবন করা হয় এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদকসেবী ও অপরিচিত লোকজনের অবাধ যাতায়াতের কারণে ভবনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। প্রকাশ্যে মদ্যপান করে মাতলামি ও অসংলগ্ন আচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তাদের ভাষ্য, পরিবার নিয়ে বসবাস করলেও এখন নিজেদের ভবনেই নিরাপদ বোধ করছেন না তারা। বিশেষ করে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, তাদের সন্তানদের তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে স্কুল-কলেজে যাতায়াতের সময়ও সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে বলে জানান তারা।
নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যের অভিযোগ
ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, ভবনে বসবাসকারী ও আসা-যাওয়া করা নারী ও তরুণীদের উদ্দেশে কটূক্তি, বাজে মন্তব্য ও অশালীন অঙ্গভঙ্গি করা হয়। তাদের দাবি, এমন আচরণের কারণে অনেক নারী স্বাভাবিকভাবে লিফট বা সিঁড়ি ব্যবহার করতেও অস্বস্তি বোধ করেন। ভবনের মতো একটি আবাসিক স্থানে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
ফ্ল্যাটে বসবাসকারীরা লিফট-সিঁড়িতে প্রস্রাব, নোংরা পরিবেশের অভিযোগ করে বলেন, লিফট ও সিঁড়িতে প্রস্রাব করে রাখা হয়। ভবনের বিভিন্ন স্থানে সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ ফেলে রাখা এবং মদ্যপানের পর বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য ছড়িয়ে রাখার অভিযোগও করেছেন তারা।
ফ্ল্যাট মালিকদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশ নোংরা করছে না, বরং যত্রতত্র জ্বলন্ত সিগারেট ফেলে রাখায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
ছাদ ও আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন: পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে কমিটির অনুমতি ছাড়াই কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং ভাড়ার অর্থ নিজে ভোগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পার্কিং স্পেস নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া ছাদের একটি বড় অংশ দখল করে দেয়াল নির্মাণ করে কয়েকটি কক্ষ তৈরি এবং সেগুলো ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছাদের দরজায় তালা লাগিয়ে অন্য ফ্ল্যাট মালিকদের সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পরিচালনা কমিটির দাবি, ছাদে মোবাইল ফোন কোম্পানির টাওয়ার স্থাপন করেও ভাড়া ও অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব স্থাপনা ও অর্থ লেনদেনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
‘আইনের তোয়াক্কা না করেই নির্মাণ’
ফ্ল্যাট মালিকদের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করেই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল।
ফ্ল্যাট মালিকদের ভাষ্য, ভবনটিতে ২৮টি পরিবার বসবাস করছে। তাদের অভিযোগ, ছাদে ঘরতুলে মদ্যপানসহ সারাক্ষণ তালাবদ্ধ কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো ভবনের বাসিন্দারা এক ধরনের জিম্মি পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।
তারা বলেন, ভবনের মেরামত বা সংস্কারকাজ করতেও বাধার মুখে পড়তে হয় এবং টাকা দাবি করা হয়। ছাদ, আন্ডারগ্রাউন্ড, পার্কিংসহ ভবনের সাধারণ ব্যবহারের জায়গাগুলো নিয়েও নিয়মিত বাধা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।
অভিযোগ অস্বীকার নোমান চৌধুরীর
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি, কুমিল্লা জেলা শাখার সহ-সভাপতি ও কুমিল্লা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নোমান চৌধুরী। আজিজ ফয়জুন্নেছা টাওয়ারের সম্পত্তিতে অ্যাডভোকেট সোয়েবুর রহমান সোয়েবের কোনো বৈধ মালিকানা নেই। তাঁর দাবি, সম্পত্তিটি পূর্বে তাঁর দাদার মালিকানাধীন ছিল এবং পরে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপরও সোয়েব সেখানে জোরপূর্বক অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নোমান চৌধুরী আরও দাবি করেন, সোয়েবের বিরুদ্ধে এর আগেও থানায় একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
উপস্থিত ফ্ল্যাটের মালিকরা বলেন, একই ভবনকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, মাদক, দখল, নারীকে উত্ত্যক্ত করা, অনুমোদনহীন নির্মাণ ও নিরাপত্তাহীনতার মতো একের পর এক অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা কামনা করছে,তারা যেনো শান্তিতে বসবাস করতে পারেন সেই সহযোগিতা চাচ্ছেন।