মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা
সীমান্তবর্তী কুমিল্লায় কাঁটাতারের ফাঁকফোকর দিয়ে আসা মাদকের বিষে নীল হয়ে যাচ্ছে কিশোর-তরুণদের একটি অংশ। নগরীতে এখন হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। একই চিত্র গ্রামের পাড়া-মহল্লাতেও। সহজলভ্য মাদকের টাকা জোগাড় করতে কিশোর-তরুণদের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে। মাদকের বিস্তারে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জেলাগুলোর মধ্যে কুমিল্লায় মাদকাসক্তের সংখ্যা বেশি। জেলার ১২টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মাদকসেবীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে মাদকবিরোধী অভিযান চললেও মাদকের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছে মূলত বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা।
কুমিল্লা নগরীতে মাদকের বড় একটি অংশ প্রবেশ করছে সীমান্তবর্তী বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, সদর, সদর দক্ষিণ ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব উপজেলায় পাঁচ শতাধিক মাদক কারবারি সরাসরি মাদক কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কসহ বিভিন্ন রুটে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা ১০ বিজিবির দপ্তরে প্রায় ৫২ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য ধ্বংস করা হয়। এর বাইরে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে নিয়মিত জব্দ হচ্ছে মাদকের চালান।
সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল রেলস্টেশনও মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে মাদক কারবারিদের তৎপরতা দীর্ঘদিনের। এমনকি মাদক কারবারিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদেরও বাধার মুখে পড়তে হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী আবুল হোসেন জানান, তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা। ট্রেনে করে মাদক ও চোরাচালানের বিষয়ে নিউজ হলে একদিন অভিযান হয়। মাসের বাকি ২৯ দিন সবকিছু আগের মত পাচার হয়।
সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক নগরীর বিভিন্ন অলিগলি, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত বাড়িতে প্রকাশ্যেই সেবন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের একটি অংশও মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় ছেলেদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন মেয়েদের মধ্যেও এর বিস্তার ঘটছে।
নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, এখন অলিতে গলিতে ১৫-২০ বছরের ছেলেরা সবার সামনে গাঁজা ইয়াবা সেবন করছে। কেউ কিছু বললেই পুরো গ্যাং নিয়ে এসে হামলা করে। তাই ভয়ে কেউ কিছু বলে না।
মাদকের বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অপরাধ। মাদকের টাকা জোগাড় করতে কিশোর-তরুণদের একটি অংশ চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
কাপ্তানবাজার এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোডেন বলেন, গেলো এক বছরে যে পরিমান ডিশলাইনের তারসহ ছিকচে চোর ও ছিনতাইকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তা গত ৫০ বছরেও দেখা যায়নি। শুধুমাত্র মাদকের টাকা জোগাড়ে চুরি ছিনতাই বেড়েছে।
অভিযান চলছে, সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
কুমিল্লায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকায় তিনতলার একটি ভাড়া বাসায় চলছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যালয়। সেখানে একজন উপপরিচালক ও দুজন পরিদর্শকসহ মোট জনবল ২৬ জন।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে ২৫৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৮৪ জনকে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল ও পরিবহন সুবিধা কম থাকায় পর্যাপ্ত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুমিল্লা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. বজলুর রহমান বলেন, জনবল ও পরিবহন সংকটের মধ্যেও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ২৫৬টি মামলা করা হয়েছে এবং এসব মামলায় ২৮৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার রোধে শুধু অভিযান নয়, মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ইউনিটের সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি।
সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনুর দাবি, লোক দেখানো অভিযান নয়, মাদকের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সীমান্ত থেকে নগরীর অলিগলি পর্যন্ত মাদক সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্ত কিশোর-তরুণদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগও বাড়াতে হবে।
মূল হোতাদের বিরুদ্ধে অভিযান হবে জানিয়ে
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি করে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গাঁজা, মদ ও ইয়াবার পাশাপাশি নতুন ধরনের কিছু মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব মাদক ইনজেকশনের মাধ্যমে সেবন করতে হয়। সীমান্ত দিয়ে এসব মাদক যাতে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সীমান্তে ড্রোনসহ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
সরাইল রিজিয়ন বিজিবির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হচ্ছে।