আয়েশা আক্তার
৩২ বছর ধরে কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়েতে যাত্রীবাহী বিমানের চাকা ঘোরেনি। বিমান ওঠানামা না করলেও থেমে নেই বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ডিভিওআর ও ডিএমই নেভিগেশন সিগন্যালের মাধ্যমে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের উড়োজাহাজকে আকাশপথে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে বিমানবন্দরটি। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ রানওয়েকেই এবার বানানো হয়েছে বাণিজ্যমেলার মাঠ!
প্রশাসনের আপত্তি, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ কিংবা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, কোনো কিছুই যেন থামাতে পারেনি আয়োজন। শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকায় উদ্বোধন হয়ে গেছে বাণিজ্যমেলা।
অভিযোগ রয়েছে, মেলার জন্য রানওয়ের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি করে ডেকোরেশন ও লাইটিংয়ের পিলার বসানো হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে ভারী রাইড ও বিভিন্ন অবকাঠামো। এতে রানওয়ের ক্ষতির পাশাপাশি বিমানবন্দরের ভিওআর নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই মেলার অনুমোদন দিল কে? কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের দাবি, তারা মেলার কোনো অনুমোদন দেয়নি। তাদের কাছে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনো আবেদনও করা হয়নি। পুলিশ প্রশাসনও মেলার বিষয়ে অবগত নয় বলে জানিয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অবস্থানও একই রকম। তাহলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতসারে এত বড় আয়োজন কীভাবে রানওয়েতে গড়ে উঠল—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন কুমিল্লাবাসী।
বিমান নেই, কিন্তু কোটি টাকার কার্যক্রম
কুমিল্লা নগরের ঢুলিপাড়া, নেউরা ও রাজাপাড়া এলাকায় প্রায় ৭৭ একর জায়গাজুড়ে বিমানবন্দরটি অবস্থিত। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত এ বিমানবন্দর একসময় নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করত। ১৯৯৪ সালে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও যাত্রী সংকটে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর কেটে গেছে প্রায় ৩২ বছর। তবে বিমানবন্দরটি একেবারে অচল নয়। এখানে বর্তমানে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। ডিভিওআর ও ডিএমই নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করে প্রতিদিন ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই নেভিগেশন সেবা থেকে সরকার প্রতি মাসে প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। অর্থাৎ, যাত্রীবাহী বিমান না নামলেও কুমিল্লা বিমানবন্দর থেকে সরকারের আয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
যে রানওয়ে চালুর দাবি, সেখানেই মেলার আয়োজন! দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লাবাসী বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। বিমানবন্দরটি চালু হলে প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কুমিল্লার অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসতে পারে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনার বিমানবন্দরেই এখন বসেছে বাণিজ্যমেলা। স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিমানবন্দর চালুর জন্য যেখানে রানওয়ে সংস্কার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কথা, সেখানে রানওয়ে খুঁড়ে মেলার অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি বা সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?
নেভিগেশন সিগন্যালেও ঝুঁকি? বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রানওয়ের ওপর উঁচু টাওয়ার, বড় রাইড ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হলে ভিওআর নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এতে উড়োজাহাজের নেভিগেশন সিস্টেমে ‘এরর’ বা সংকেতজনিত সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আকাশপথে নিয়মিত উড়োজাহাজ চলাচলকারী একটি বিমানবন্দরের নেভিগেশন ব্যবস্থার পাশে এমন স্থাপনা নির্মাণ কতটা নিরাপদ—তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ও নেভিগেশন সিগন্যালের ঝুঁকির বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও মেলার আয়োজন থামেনি।
আয়োজক কারা—প্রশাসনই জানে না! কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাহেব আলী বলেন, বিমানবন্দরে বাণিজ্যমেলার জন্য আমরা কোনো অনুমোদন দিইনি। তারা আমাদের কাছে আবেদনও করেনি। মেলা বন্ধের দাবি জানিয়ে দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখার ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, বিমানবন্দরে বাণিজ্যমেলার বিষয়ে আমরা অবগত নই।
অন্যদিকে মেলার আয়োজক হিসেবে পরিচয় দেওয়া বিল্লাল হোসেন দাবি করেন, প্রতিবছরের মতো এবারও তারা মেলার আয়োজন করেছেন। তার ভাষ্য, যেখান থেকে অনুমোদন নেওয়া দরকার, আমরা সেখান থেকেই অনুমোদন নিয়েছি। তবে কোন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সেই অনুমোদন নেওয়া হয়েছে—তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
‘জুয়া মেলা’র অভিযোগও ;স্থানীয়দের অভিযোগ, বাণিজ্যমেলার আড়ালে লটারি বা কুপনভিত্তিক কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। অতীতেও এ ধরনের আয়োজন নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি তাদের। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মেলার আয়োজন নিয়ে কুমিল্লা দোকান মালিক সমিতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জামাল খন্দকার বলেন, মেলায় নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের ঠকানোর অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মেলার কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
প্রশ্নের মুখে স্থানীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনের ভূমিকা; একটি বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকায় বড় পরিসরের মেলা। রানওয়ে খুঁড়ে স্থাপনা নির্মাণ। ভারী রাইড বসানো। নেভিগেশন সিগন্যাল নিয়ে ঝুঁকির আশঙ্কা। অথচ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের এবং জেলা প্রশাসন বলছে তারা অনুমোদন দেয়নি, পুলিশ বলছে তারা অবগত নয়, আর আয়োজক বলছেন প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।
তাহলে কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে মেলা?
কার নির্দেশে বিমানবন্দরের রানওয়ে ব্যবহার করা হলো? প্রশাসনের আপত্তি থাকলে মেলা উদ্বোধন হলো কীভাবে?
আর গুরুত্বপূর্ণ নেভিগেশন সিস্টেম ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও কার স্বার্থে রানওয়েতে মেলা বসানো হলো? কুমিল্লাবাসীর দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে মেলার অনুমোদন, আয়োজকদের পরিচয়, রানওয়ে ব্যবহারের বৈধতা এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঝুঁকি খতিয়ে দেখা হোক। কারণ, যে রানওয়েতে একদিন আবার বিমানের চাকা ঘোরার স্বপ্ন দেখছে কুমিল্লাবাসী, সেই রানওয়েতেই যদি মেলার নামে খোঁড়াখুঁড়ি ও স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়, তাহলে বিমানবন্দর চালুর স্বপ্ন কি ধীরে ধীরে মাটিচাপা পড়ছে? আর শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই,‘খুঁটির জোর’ কোথায়?