প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 6 Apr 2026, 8:31 AM
চান্দিনায় মহাসড়কে ডিভাইডার কেটে অবৈধ ইউ‑টার্ন
সোহেল রানা, চান্দিনা
দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা অংশ যেন এখন নিয়মনীতির বাইরে ‘যার যেমন খুশি’ ব্যবহারের জায়গায় পরিণত হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা, নকশা ও আইন উপেক্ষা করে একের পর এক সড়ক বিভাজক (ডিভাইডার) কেটে তৈরি করা হচ্ছে অবৈধ ইউ-টার্ন। এতে প্রতিদিনই ঝুঁকির মুখে পড়ছে হাজারো যাত্রী। অভিযোগ উঠেছে—এই অনিয়মে জড়িত থাকতে পারে হাইওয়ে পুলিশও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চান্দিনার মাধাইয়া এলাকার নাওতলায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অনুমোদিত দুটি ইউ-টার্ন রয়েছে। একটি নাওতলা ইসলামিয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার পূর্ব পাশে এবং অন্যটি পশ্চিমে সাহারপাড়া এলাকায়। কিন্তু এই দুই বৈধ ইউ-টার্নের মাঝখানে, প্রায় ৫০০ মিটার ব্যবধানে মাদ্রাসার সামনেই ডিভাইডার কেটে তৈরি করা হয়েছে আরেকটি অবৈধ ইউ টার্ন। এই অবৈধ পথ দিয়ে পারাপারের সময় সিএনজি, অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, এতে অনেকে আহত হয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডিভাইডারের কংক্রিট ভেঙে সেখানে মাটির ঢাল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের সাইনবোর্ড, সতর্কতা বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। ফলে সিএনজি, অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল হঠাৎ করেই মহাসড়কে উঠে বিপজ্জনকভাবে পারাপার করছে। এতে দ্রুতগতির বাস ও ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে কুটুম্বপুর এলাকার দরানিপাড়ায়। সেখানেও একটি কুটুম্বপুর ফরাজী বাড়ির সামনে এবং দরানিপাড়া মসজিদ এলাকায় বৈধ ইউটার্ন রয়েছে। এই দুই বৈধ ইউ টার্ন থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২০০ মিটার দূরে, ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার সামনেই ডিভাইডার কেটে তৈরি করা হয়েছে আরেকটি অবৈধ পারাপারের পথ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই ডিভাইডার কাটার কাজে জড়িত থাকতে পারে হাইওয়ে থানা পুলিশ নিজেই। এমনকি তাদের সরকারি গাড়িও নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করছে।
স্থানীয় সিএনজি চালক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার সামনে সড়কের ডিভাইডার কেটে যে অবৈধ পথ তৈরি করা হয়েছে, তা সিএনজি বা অটোরিকশা চালকদের পক্ষে করা সম্ভব নয়; সাধারণ চালকদের এমন সাহস নেই যে তারা ডিভাইডার কেটে পথ তৈরি করবে। আমরা তিন চাকার চালকরা পুলিশ দেখলেই ভয়ে মহাসড়ক এড়িয়ে চলি। হাইওয়ে পুলিশের সুবিধার্থে যানবাহন সহজে পারাপারের জন্যই এই পথ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরও অনেকেই একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
নাওতলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. মানছুর ইসলাম বলেন, মাধাইয়ার নাওতলা এলাকায় “দুই পাশে বৈধ ইউটার্ন থাকা সত্ত্বেও মাঝখানে ডিভাইডার কাটা হয়েছে। এটি সরাসরি মৃত্যুফাঁদ। কিছু দিন আগে এই পথ দিয়ে পারাপারের সময় সিএনজি ও প্রাইভেটকারের সংর্ঘষের ঘটনা ঘটেছে। এঘটনায় সিএনজির কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। ”
নাওতলা ইসলামিয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার নূরানীয়া ও হাফিজিয়া শাখার প্রধান শিক্ষক হাফেজ মাহমুদ হাসান বলেন, “আমাদের মাদ্রাসার পূর্ব পাশে মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে একটি বৈধ ইউ-টার্ন থাকা সত্ত্বেও কিছু স্থানীয় ব্যক্তি সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের সঙ্গে নিয়ে সড়কের ডিভাইডার কেটে সম্পূর্ণ অবৈধ একটি পথ তৈরি করেছে। এই পথটি শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইতোমধ্যে এই অবৈধ পথ ব্যবহার করতে গিয়ে কয়েক মাস আগে আমাদের মাদ্রাসার একজন শিক্ষক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
এছাড়া মাদ্রাসার পশ্চিম পাশেও আরেকটি বৈধ ইউ-টার্ন রয়েছে, ফলে এই অবৈধ পথের কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি, জননিরাপত্তার স্বার্থে এই অবৈধ পথটি দ্রুত বন্ধ করা হোক এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”
দূরপাল্লার বাসচালক আবদুল কাদের বলেন, “মহাসড়কে নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ি চালাতে হয়। হঠাৎ সামনে ছোট যানবাহন উঠে পড়লে দুর্ঘটনা এড়ানো অসম্ভব হয়ে যায়। এসব অবৈধ ইউটার্ন আমাদের জন্য আতঙ্ক।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ইউটার্ন চালু থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে সংশ্লিষ্টদের বেপরোয়া আচরণ দিন দিন বাড়ছে।
জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত, এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (এআইপি) অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, এ ধরনের অবৈধ ইউটার্ন “হাই-রিস্ক কনফ্লিক্ট জোন” তৈরি করে, যেখানে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে হঠাৎ সংঘর্ষের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।
তিনি অবিলম্বে সব অবৈধ ইউটার্ন বন্ধ করে ডিভাইডার পুনঃস্থাপন, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মহাসড়কে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন- সকলের সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, হাইওয়ে থানার সামনের ডিভাইডার কাটার অভিযোগ সত্য নয়। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কে বা কারা ডিভাইডার কেটে পথটি তৈরি করেছে তা আমাদের জানা নেই। পুলিশের পক্ষ থেকে এই পথ তৈরি করা হয়নি এবং সরকারি কোনো গাড়িও এটি ব্যবহার করে না। তাঁর দাবি পুলিশ এই পথ ব্যবহার করছে না।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কুমিল্লা উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, “মহাসড়কের ডিভাইডার কাটা সম্পূর্ণ অবৈধ। খুব শিগগিরই এসব অবৈধ পারাপারের পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
বিশ্বকাপ উন্মাদনায় কুবিতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আনন্দ মিছিল
কুবি প্রতিনিধি বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় মুখর হয়ে উঠেছে সারা বিশ্ব। প্রতি চার বছর পর বিশ্বকাপ...
কুমিল্লা সদর দক্ষিণে যুবকের লাশ উদ্ধার
নিজস্ব প্রতিবেদক, সদর দক্ষিণকুমিল্লা সদর দক্ষিণে সুমন মিয়া (২৫) নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুল...
মেঘনায় যাত্রীবাহী বাস খাদে,
মেঘনায় যাত্রীবাহী বাস খাদে, আহত দুই চিকিৎসকসহ আহত ১১ কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি য...
শিবির নেতা জিসান সুস্থ প্রমানিত হলে আদালতে নেওয়া হতে পারে
নিজস্ব প্রতিবেদক ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলা...
আওয়ামীলীগ-যুবলীগের পদধারী নেতাদের সাথে কুমিল্লা ১০ নির্বাচনী...
নিজেস্ব প্রতিবেদককুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-লালমাই) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া লালমাই...
চিকিৎসকদের নিয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদে মেঘনায় বিক্ষোভ
চিকিৎসকদের নিয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদে মেঘনায় বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি কুমিল্লার...