প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: আন্তর্জাতিক | প্রকাশ: 5 Apr 2026, 10:29 PM
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশল: বদলে যেতে পারে বৈশ্বিক নৌ চলাচল ব্যবস্থা
এফএনএস আনন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া জাহাজ চলাচলে শর্ত বা টোল আরোপের ইঙ্গিত দিয়ে ইরান এমন এক পদক্ষেপের পথে হাঁটছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক আইনের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিতে পারে। এই পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। এই সংঘাত এখন নতুন এক ফ্রন্টে পৌঁছেছে। আর সেটি স্থল বা আকাশে নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে। ইরান গত বৃহস্পতিবার আবারও বলেছে যে তারা ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রটোকল তৈরি করছে, যার মাধ্যমে এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল তদারকি করা হবে। একই সঙ্গে তেহরান থেকে এমন ইঙ্গিতও এসেছে যে প্রণালিটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর শর্ত আরোপ বা এমনকি টোল নেয়া হতে পারে। এতে জরুরি প্রশ্ন উঠেছে যে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
টোল আরোপ কি বৈধ?
এই প্রশ্নে বিশেষজ্ঞদের মত পরিষ্কার। তারা বলছেন- সাধারণভাবে এটি বৈধ নয়। রুহাল বলেন, ‘শুধুমাত্র প্রণালি দিয়ে যাওয়ার কারণে বিদেশি জাহাজের ওপর কোনও অর্থ আরোপ করা যাবে না।’
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌপথে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’-এর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আইনের ৩৭ থেকে ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাহাজ ও উড়োজাহাজকে অবাধ ও দ্রুত চলাচলের সুযোগ দিতে হবে, যা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। বিশেষ করে ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র চলাচলের জন্য কোনো ফি আরোপ করা যাবে না। তবে নির্দিষ্ট সেবা, যেমন পাইলটিং বা বন্দর সহায়তা দিলে ফি নেয়া যেতে পারে। ইরানের সম্ভাব্য টোল বা শর্ত আরোপের পরিকল্পনা সামুদ্রিক খাতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রুহাল বলেন, ‘শুধুমাত্র চলাচলের জন্য টোল বা জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রবেশাধিকার নির্ধারণ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’। তিনি বলেন, সুয়েজ বা পানামা খালের মতো কৃত্রিম সমুদ্রপথে টোল নেয়া হয়, কিন্তু হরমুজের মতো প্রাকৃতিক প্রণালিতে তা প্রযোজ্য নয়। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টোল ব্যবস্থা চালু হলে এটি একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পথকে নিয়ন্ত্রিত গেটওয়েতে পরিণত করবে। তবে ইরানের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধুই আইনি ইস্যু নয়। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধাবস্থায় আছি, তাই শান্তিকালীন নিয়ম এখানে প্রযোজ্য নয়।’ জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজা খানজাদেহ বলেন, ইরান নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ ব্যয়ের কারণে নতুন আয়ের উৎস খুঁজছে। তার মতে, এই পরিকল্পনা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগতও। তিনি বলেন, এটি দক্ষিণ চীন সাগরের মতো অন্য বিতর্কিত অঞ্চলেও অনুকরণীয় হতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়। বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি বাজারের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বীমা খরচ বাড়ায় অনেক কোম্পানি এই পথ এড়িয়ে চলছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ৩১ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ২৯২টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথে চলেছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৯৫ শতাংশ কম। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের যে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, এই পরিসংখ্যান সেটিকেই ইঙ্গিত করে। চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশপাশে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড সতর্ক করে বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কেউ এই পথ ব্যবহার করলে তা লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি ‘বিশ্বের জন্য খোলা’, কিন্তু ‘শত্রুদের জন্য বন্ধ’। ইরানের সামরিক মুখপাত্র আবোলফজল শেখারচি আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এই প্রণালি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকবে।
ইরানের শেষ হাতিয়ার?
খানজাদেহ মনে করেন, ইরানের হাতে থাকা শেষ বড় কৌশলগত হাতিয়ারগুলোর একটি হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। তিনি বলেন, ‘প্রক্সি দুর্বল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত, অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ছে, এই অবস্থায় ইরান তাদের শেষ দরকষাকষির অস্ত্র ধরে রাখতে চাইছে।’ এমন অবস্থায় আইন ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যই এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খানজাদেহ বলেন, টোল আরোপ আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হলেও বাস্তবে অনেক কোম্পানি যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে অর্থ দিতে পারে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করা অনেক সময় যে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে, এই ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে। রুহালের মতে, ভারত, চীন, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর যারা এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল, তারা এটি খোলা রাখতে আগ্রহী। তারা কূটনৈতিক প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় এবং যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তবে এখনও কেউ সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেছে, আর চীন ও ভারতও এ বিষয়ে নীরব। অবশ্য এই ইস্যুতে বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলো জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরাপত্তা চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে দায়ী করছে চীন। ফলে হরমুজ প্রণালি বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এমন অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে স্বল্পমেয়াদে হরমুজের বিকল্প নেই। এটি এখনও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অপরিহার্য পথ। বিশ্লেষকদের মতে, যদি বিভিন্ন দেশ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে টোল আরোপ শুরু করে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা মৌলিকভাবে বদলে যাবে। খরচ বাড়বে, অনিশ্চয়তা বাড়বে এবং রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাবে। সবশেষে প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে- আন্তর্জাতিক আইন কি আধুনিক যুদ্ধ ও শক্তির রাজনীতির চাপে টিকে থাকতে পারবে? হরমুজ প্রণালিতে যা ঘটবে, তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ নয় বরং বৈশ্বিক সমুদ্রপথে আইন ও শক্তির ভারসাম্যও নির্ধারণ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনে কী বলা আছে
যদিও ইরান ও ওমান উভয়েরই এই প্রণালির ওপর ভৌগোলিক দাবি রয়েছে, সামুদ্রিক আইনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা জাহাজ চলাচলের ওপর ইচ্ছামতো অর্থ আদায় করতে পারে না। মাল্টার ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ল’ ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা আইনের অধ্যাপক সঞ্জীত রুহাল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনে হরমুজ প্রণালি কোনও রাষ্ট্রের একক সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণে নয়’। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইরান ও ওমান তাদের নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় সার্বভৌমত্ব রাখলেও তা সীমাবদ্ধ। কারণ, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিতে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’-এর অধিকার রয়েছে, যা বাধাগ্রস্ত করা যায় না। তিনি বলেন, ‘এই পথ দিয়ে চলাচল হতে হবে অব্যাহত ও দ্রুত এবং তা ব্যাহত করা যাবে না’। রুহাল আরও বলেন, উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরান ও ওমান নিরাপত্তা, নৌ চলাচল, দূষণ ও সমুদ্রপথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সীমিত কিছু নিয়ম করতে পারে, কিন্তু তারা এটিকে অনুমতিনির্ভর পথ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। এখানে শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয় বরং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিয়ম ভবিষ্যতে কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইনগতভাবে হরমুজ প্রণালির অবস্থান বিশেষ ধরনের। ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্রপথ উপসাগরকে ওমান সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। এটি ইরান ও ওমানের সমুদ্রসীমার মধ্যে থাকলেও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পরিচালিত হয়।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও টেকসই করতে জোর দেয়া...
আয়েশা আক্তারকুমিল্লা নগরীর যানচলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক টমছমব্রিজ থেকে ইপিজেড হয়ে মেডিকেল পর্য...
ব্রাহ্মণপাড়ায় পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষণের চেষ্টা অভিযোগে এক ব্যক...
মো. আনোয়ারুল ইসলামকুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া ৫ বছরের এক কন্যা শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনায় মো. ইদ্রিস ম...
মুরাদনগরে আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে কৃষককে কুপিয়ে হত্যার অভিযো...
বেলাল উদ্দিন আহাম্মদকুমিল্লার মুরাদনগরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাওলা সরকার (৪৫) নামের এক কৃষক...
সাংবাদিক সমিতি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা শাখার নতুন কমিটি গঠন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণপাড়াবাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা শাখার নতুন কমিট...
খাগড়াছড়িতে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ সদস্য নিহত
শ্যামল রুদ্রখাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেট...
চৌদ্দগ্রামে শিক্ষকের অপমান সইতে না পেরে স্কুলছাত্রীর আত্মহ...
এমরান হোসেন বাপ্পিকুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে শ্রেণীকক্ষে সহপাঠিদের সামনে ওয়ারিশা আফরিন ফারিয়া নামে এক স্ক...