আয়েশা আক্তার
দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পরিবারের প্রভাব, ভাঙারির দোকানিদের দখল আর ময়লা-আবর্জনার স্তূপে বিপর্যস্ত কুমিল্লার ঠাকুরপাড়া বিসিক শিল্পনগরী এলাকা। দখল ও দূষণে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে শতবর্ষী মহাশ্মশানসংলগ্ন সরকারি পুকুর। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পানি নিষ্কাশনের পথ, বাড়ছে জলাবদ্ধতা। এতে একদিকে শিল্পনগরীর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাঁদের অভিযোগ, শ্মশানে মরদেহ নিয়ে যাওয়া, দাহকাজ ও পূজা-অর্চনা করতেও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঠাকুরপাড়া মহাশ্মশানের প্রবেশপথসংলগ্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। পুকুরপাড়ে গড়ে উঠেছে বিশাল জায়গা জুড়ে ভাঙারির দোকান। দোকানের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পরিত্যক্ত সামগ্রী ও বর্জ্য। কোথাও কোথাও ড্রেনের মুখ ময়লায় বন্ধ হয়ে আছে, জমে সৃষ্টি হচ্ছে ডেঙ্গু মশার লার্ভা। ফলে বৃষ্টি ছাড়াও পানি জমে থাকছে, আর বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শতবর্ষ ধরে ব্যবহৃত মহাশ্মশানের প্রবেশপথে এমন অব্যবস্থাপনা তাঁদের ধর্মীয় কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে সরকারি পুকুরটি ধীরে ধীরে ভরাট করে দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা চললেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
বিসিক শিল্পনগরীর ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে শিল্প এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। নতুন সড়ক ও ড্রেনের কার্যকারিতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটার অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, শিল্পনগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দখলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিক মালিক সমিতির একাধিক সদস্য বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই পরিস্থিতি চললেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। শিল্পনগরীর পরিবেশ রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
পুকুরপাড়ের এক ব্যবসায়ী বলেন, ভাঙারির দোকানগুলো না থাকলে পুকুরপাড়ের পরিবেশ অনেক বেশি সুন্দর ও ব্যবহারোপযোগী থাকত। দোকান ও বর্জ্যের কারণে চারপাশ নোংরা হয়ে পড়েছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেদ রনি বলেন, ভাঙারির দোকান ও ময়লা-আবর্জনার কারণে পুরো এলাকা নোংরা হয়ে গেছে। ড্রেনের কাজও অসম্পূর্ণ। এভাবে চলতে থাকলে রোগব্যাধির ঝুঁকি আরও বাড়বে। আমরা চাই, এলাকাটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হোক।
চা-দোকানি আবুল বাশার বলেন, এখানকার বর্তমান পরিবেশ আমাদের কাম্য নয়। আমরা ছোট ব্যবসায়ী, পরিবেশ ভালো থাকলে আমাদেরও উপকার হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিসিকের মালিকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ভাঙারির দোকানমালিক আবদুল মালেক বলেন, আগে যার কাছ থেকে নিয়েছি সেই মালিক মারা গেছেন। এখানে আরও কয়েকটি দোকান রয়েছে। জায়গাটি সরকারি হওয়ায় আমরা এখানে গরিবিয়ানা ভাবে ব্যবসা করছি। কেউ আগে কিছু বলেনি। আমার দোকানের বাইরে কিছু পরিত্যক্ত জিনিস রয়েছে। কেউ আপত্তি জানালে সেগুলো সরিয়ে দেব। সরকারি জায়গা থেকে চলে যেতে বললে চলে যেতে হবে। আমরাও চলে যাবো। তবে এখন পর্যন্ত কেউ বলে নাই।
উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: বিসিক ডিজিএম ;কুমিল্লা বিসিক শিল্পনগরীর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. মুনতাসীর মামুন বলেন, বিসিকের খালি জায়গায় কিছু অস্থায়ী দোকান স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো উচ্ছেদের বিষয়ে কমিটিতে প্রস্তাব তোলা হয়েছে এবং রেজুলেশন পাস হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে, শিগগিরই উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, সিটি করপোরেশন এলাকার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের, আর এর বাইরে থাকা স্থাপনার বিষয়ে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের মাধ্যমে অবৈধ দোকানগুলোর জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
পুকুরের বিষয়ে তিনি বলেন, পুকুরের কিছু অংশের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেখানে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনকে জায়গা দেওয়া এবং গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
দখলমুক্ত বিসিক ও দূষণমুক্ত পরিবেশের দাবি; শিল্পনগরীর ভেতরে সরকারি জায়গায় ভাঙারির দোকান, পুকুরপাড়ে বর্জ্যের স্তূপ, ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা এবং মহাশ্মশানে যাতায়াতের দুর্ভোগ, সব মিলিয়ে ঠাকুরপাড়া এলাকায় জনভোগান্তি বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি জায়গা ও শতবর্ষী পুকুরের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মহাশ্মশানে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার পালনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, সরকারি পুকুর সংরক্ষণ, ড্রেনের কাজ সম্পন্ন এবং নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসক, বিসিক কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং দীর্ঘদিনের দখল-দূষণের অবসান ঘটিয়ে বিসিক শিল্পনগরীকে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনবে।