আয়েশা আক্তার
অনুমোদিত নকশা, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও বিল্ডিং কোডের তোয়াক্কা না করেই কুমিল্লা নগরীতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, কোথাও অনুমোদনের বাইরে নির্মাণ, আবার কোথাও সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেনের জায়গা দখল করে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে নগরীতে অভিযান চালিয়ে আটটি ভবন পরিদর্শন করেছে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে চারটির নির্মাণকাজ বন্ধ এবং চারটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তলব করা হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে নগরীর ফৌজদারী মোড়, কান্দিরপাড় ও ভিক্টোরিয়া কলেজ রোড এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবুর নেতৃত্বে অভিযানে অংশ নেন অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন খান, সহকারী অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ শরীফুল হক, ইমারত পরিদর্শক মোহাম্মদ রিফাত, সার্ভেয়ার মোহাম্মদ ওমর ফারুক, উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল হক ও উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন চন্দ্র নাথ।
অভিযানকালে ডেলমন টাওয়ার, সিলভার টাওয়ার, সিলভার আলী টাওয়ার, কাজী টাওয়ার, নন্দী রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপার্স প্রাইভেট লিমিটেডের ভবন, ইব্রাহিম কাজী টাওয়ারসহ মোট আটটি ভবন পরিদর্শন করা হয়।
কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে কয়েকটি ভবনের নির্মাণকাজ নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ উঠে আসে। বিল্ডিং মালিকদের পক্ষের লোকজন প্রয়োজনীয় অনুমোদনপত্র ও কাগজপত্র যথাযথভাবে দেখাতে পারেননি। আবার কোথাও অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনকি কোনো কোনো ভবনের নির্মাণ সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেনের নির্ধারিত জায়গার দিকে চলে আসার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
অভিযানের সময় কাজী টাওয়ারের মালিকপক্ষরা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দেখাতে না পারায় ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক ও নির্মাণকারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের মিল পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করা ভবনগুলোতে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ করা যাবে না। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু বলেন, যারা নিয়ম ভঙ্গ করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাদের কাগজপত্র নেই, তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আগামীতে যেন বিল্ডিং কোড না মেনে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করতে না পারে, সেজন্যই আমাদের এই অভিযান।
চেয়ারম্যানের বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু নির্মাণকাজ বন্ধ করেই বিষয়টি শেষ হচ্ছে না; কাগজপত্র ও অনুমোদন যাচাই করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী অনেক ভবন মালিক ও ডেভেলপার নিজেদের সুবিধামতো নির্মাণ করতে গিয়ে সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেনের জায়গা সংকুচিত করে ফেলছেন। এতে একদিকে যেমন নগরীর সৌন্দর্য ও পরিকল্পিত কাঠামো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে যানজট, জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগও বাড়ছে।
প্রশ্ন উঠেছে—অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে ভবন নির্মাণের সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? নির্মাণের শুরুতেই নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না কেন? আর বছরের পর বছর ধরে এমন নির্মাণ চললেও সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণই বা কী?
তবে অভিযানে যেসব ভবনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট মালিক বা ডেভেলপারদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এই অভিযান এখন নগরবাসীর মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। নগরবাসীর দাবি, কয়েকটি ভবনে অভিযান সীমাবদ্ধ না রেখে অনুমোদনের বাইরে নির্মাণ, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন এবং সড়ক-ফুটপাত-ড্রেন দখলের অভিযোগ থাকা সব ভবনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হোক।
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নগরীতে নিয়ম না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।