আয়েশা আক্তার
ভাড়া দিয়ে বাসে উঠেছিলেন যাত্রীরা। গন্তব্য ছিল ঢাকা। কিন্তু নিরাপদ যাত্রার বদলে গজারিয়া হাইওয়েতে মিয়ামি এয়ারকন পরিবহনের একটি বাসে যাত্রীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কথিত হামলার ঘটনায় এখন তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে যাত্রীদের মারধর করে আহত (রক্তাক্ত) করার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার ঝড় বইছে। প্রশ্ন উঠেছে—যাত্রীসেবার নামে চলা একটি পরিবহনের কর্মীরা কীভাবে যাত্রীদের গায়ে হাত তোলার সাহস পান?
ঘটনার পর মিয়ামি পরিবহনের মালিকপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা এবং সহযোগিতার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত চালকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
কিন্তু এতেই কি দায় শেষ? হামলার পরও আপসের চাপ? ঘটনার পর ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে উঠেছে আরও গুরুতর অভিযোগ। তাদের দাবি, ঘটনার আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে না নিয়ে বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগও করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, আমরা ভাড়া দিয়ে বাসে উঠেছিলাম। কোনো অপরাধ করিনি। অথচ আমাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। এখন আবার বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা বিচার চাই। চিকিৎসার পাশাপাশি আমাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো চাপের কাছে আমরা নত হতে চাই না।
অন্য এক যাত্রীর অভিযোগ, বাসের স্টাফদের আচরণ ছিল মারমুখী। প্রতিবাদ করলেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। এমন ঘটনা যেন আর কারও সঙ্গে না ঘটে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত জরুরি।
‘ক্ষমতার দাপটের—প্রশ্ন উঠছে সেখানেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পরিবহন মালিকপক্ষের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি আপস না করলে পরিণতি ভালো হবে না—এমন ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আরও গুরুতর—একজন সাধারণ যাত্রী কি কোনো পরিবহন মালিকের প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে অসহায়?
আইনের চোখে সবাই সমান। কোনো ব্যবসায়িক প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
‘দুঃখ প্রকাশ’ নয়, জবাবদিহি চান যাত্রীরা
মিয়ামি পরিবহনের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশকে স্বাগত জানালেও সাধারণ যাত্রীদের প্রশ্ন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চালক-হেলপারদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে মিয়ামি এয়ারকন বয়কটের ডাকও দেওয়া হয়েছে। অনেকের বক্তব্য—যেখানে যাত্রীর নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত নয়, সেখানে শুধু ‘সেবা’ শব্দটি ব্যবহার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
রুট পারমিট নিয়েও তদন্তের দাবি, মিয়ামি এয়ারকনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির চালক-হেলপারদের প্রশিক্ষণ, যাত্রীদের সঙ্গে আচরণবিধি এবং রুট পারমিটের শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা।
একটি বাসে ঘটে যাওয়া ঘটনা যেন পুরো পরিবহন ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত হয়ে না দাঁড়ায়—এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—মিয়ামি এয়ারকনের ‘দুঃখ প্রকাশ’ কি সত্যিই যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি কয়েকদিন পর আবারও একই অভিযোগ সামনে আসবে?
যাত্রীদের দাবি, ক্ষমতার দাপট নয়—আইনের শাসন চাই। পরিবহন ব্যবসা যত বড়ই হোক, একজন যাত্রীর জীবন, নিরাপত্তা ও সম্মানের চেয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বড় হতে পারে না।
কুমিল্লা বাস মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম বলেন, “মিয়ামি বাসে যাত্রীদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক। ঘটনাটি পরিবহন সেক্টরের ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছে। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব মিয়ামি বাস কর্তৃপক্ষ নিয়েছেন বলে জানান। কিন্তু রফাদফার বিষয়টি আমার জানা নেই, এমনটা বলে থাকলে ঠিক করে নাই।
এ বিষয়ে বাস মালিক মো. মান্নান ও তাঁর ছোট ভাই আরেক বাস মালিক মো. শাহীনকে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে মিয়ামি বাস মালিক পক্ষের ম্যানেজার মো. মাসুদুর রহমান লিটনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংবাদ প্রকাশ না করতে দৈনিক রূপসী বাংলার প্রতিনিধিকে আর্থিকভাবে ‘ম্যানেজ’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয় । অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের দায় এড়াতে গত ১৮ আগস্ট একই চালককে দিয়ে গজারিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করিয়ে চালক-কন্টাক্টরকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টাও করা হয়েছে।