আয়েশা আক্তার
একসময় কুমিল্লার আকাশে নিয়মিত উড়োজাহাজের গর্জন শোনা যেত। দেশের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরকে ঘিরে ছিল মানুষের নানা স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই স্বপ্ন হারিয়ে যায়। একের পর এক সরকার এলেও প্রায় ৩২ বছর ধরে কুমিল্লা বিমানবন্দর পড়ে আছে অচল অবস্থায়। রানওয়েতে আর কোনো বিমান ওঠানামা করে না, টার্মিনালে নেই যাত্রীর কোলাহল। তবুও আশ্চর্যের বিষয়, বিমানবন্দরটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়। প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে, সরকার নিয়মিত রাজস্বও পাচ্ছে। অথচ সামান্য কিছু উন্নয়ন ও সংস্কারেই আবারও চালু হতে পারে এই বিমানবন্দর।
প্রশ্ন উঠছে—তাহলে এত বছর কেন চালু করা হয়নি? কার অবহেলায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি বিমানবন্দর তিন দশকের বেশি সময় ধরে অচল পড়ে রইল?
বর্তমান সরকার দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দরও। ফলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রবাসীদের জেলা, অথচ নেই বিমানসেবা
কুমিল্লাকে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে কুমিল্লা থেকে বৈধভাবে বিদেশে গেছেন ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৬৬১ জন কর্মী। একই সময়ে সারা দেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪৯ জন। অর্থাৎ দেশের মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৯ শতাংশই কুমিল্লার। ২০১৭ সালে এক লাখ চার হাজারের বেশি এবং ২০২৩ সালে এক লাখ ১৩ হাজার ৭৫১ জন কুমিল্লাবাসী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গিয়েছেন। এত বিপুল সংখ্যক প্রবাসী থাকা সত্ত্বেও তাদের যাতায়াতের জন্য নিজ জেলায় একটি সচল বিমানবন্দর নেই। ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কপথে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
শিল্প ও বাণিজ্যের সম্ভাবনাও আটকে আছে
শুধু প্রবাসী নয়, কুমিল্লা এখন দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলেও পরিণত হয়েছে। কুমিল্লা ইপিজেড, বিসিক শিল্পনগরী, অসংখ্য রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত বর্ধনশীল আবাসন ও ব্যবসা খাত এই জেলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ হবে, শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে গতি আসবে এবং কুমিল্লা একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
কী লাগবে বিমান চালু করতে? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর চালুর জন্য বিশাল কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। রানওয়ের কার্পেটিং, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে আধুনিক ভিএইচএফ (VHF) যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন, ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন করা হলে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করা সম্ভব।
তাদের মতে, অবকাঠামোর বড় অংশ এখনও ব্যবহারযোগ্য রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সময়োপযোগী সংস্কার এবং কার্যকর সরকারি সিদ্ধান্ত।
তিন দশকের অবহেলার দায় কার? স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বিমানবন্দর থেকে এখনও সরকার রাজস্ব পায়, যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে থাকে, যদি সামান্য সংস্কারেই বিমান চালু করা সম্ভব হয়—তাহলে গত ৩২ বছরে কেন কোনো সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণে আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলো দীর্ঘদিন গুরুত্ব পায়নি। ফলে কুমিল্লার মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলাও বঞ্চিত হয়েছে।
চালু হলে বদলে যাবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ : কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে শুধু কুমিল্লা নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার লাখো মানুষ সরাসরি এর সুবিধা পাবেন। জরুরি চিকিৎসা, ব্যবসায়িক সফর, শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ওপর চাপও কমবে।পর্যটন খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ময়নামতি, শালবন বিহারসহ কুমিল্লার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও সহজলভ্য হবে।
এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষা, কুমিল্লাবাসী অতীতেও বিমানবন্দর চালুর বহু ঘোষণা শুনেছেন। কিন্তু বাস্তবে তার দৃশ্যমান কোন প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাই এবারও মানুষের প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে সংশয়। সরকারের নতুন মহাপরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, কবে আবার কুমিল্লার আকাশে উড়োজাহাজের ডানা মেলবে—সেই উত্তরই এখন খুঁজছে জেলার লাখো মানুষ।
দীর্ঘ ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যদি কুমিল্লা বিমানবন্দর সত্যিই চালু হয়, তবে এটি শুধু একটি বিমানবন্দর পুনরায় চালুর ঘটনা হবে না; এটি হবে কুমিল্লার অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিল্প, প্রবাসী সেবা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।