প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 19 May 2026, 8:31 AM
মানবতার ফেরিওয়ালা “হাছান ভাই”
নিজস্ব প্রতিবেদক
কুমিল্লা শহরে “হাছান ভাই” কিংবা “সিডি হাসপাতালের হাছান ভাই” নামটি শুধু একটি পরিচয় নয়—এটি মানবতা, ভালোবাসা ও নিঃস্বার্থ সেবার এক উজ্জ্বল প্রতীক। নগরবাসীর কাছে তিনি একজন মানবিক মানুষ, ক্রীড়াপ্রেমী সংগঠক এবং অসহায় মানুষের নির্ভরতার নাম।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির একনিষ্ঠ সমর্থক ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে পরিচিত মোঃ হাসান ব্যক্তিজীবনে যেমন ছিলেন সংগ্রামী, তেমনি সমাজসেবায়ও ছিলেন অনন্য। তার স্বজন ও পরিচিতজনদের ভাষ্য, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকেই তিনি কুমিল্লার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, “হাসান একজন নিঃস্বার্থ মানুষ। তিনি কখনো নিজের জন্য কিছু চাননি, বরং সবসময় মানুষের পাশে থেকেছেন।”
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক দুইবারের ভিপি শাহ আলমের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক অবদানের জন্য কখনো কোনো স্বীকৃতি বা সনদের দাবি করেননি তিনি।
জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও হার মানেননি মোঃ হাসান। কুমিল্লা নগরীর উত্তর গাংচরে বসবাসরত এই মানুষটির কর্মজীবনের নতুন পথচলা শুরু হয় কুমিল্লার বিশিষ্ট চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক, সাবেক বিএমএ সহ-সভাপতি ডাঃ রেজাউল আলম হেলালের সহযোগিতায়।
হাসান জানান, সিডি প্যাথ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকদের মধ্যে ডাঃ রেজাউল আলম হেলাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ আবু আয়ুব হামিদ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন, সাবেক নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান ডাঃ কলিমউল্লাহ, মরহুম ডাঃ মোস্তাক আহমেদ, মরহুম ডাঃ হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ দেলোয়ার হোসেন, ডাঃ আলীনুর, ডাঃ জিয়া উদ্দিন সিকদার সজল, বিশিষ্ট দন্ত চিকিৎসক ডাঃ বদরুল আলম এবং ডাঃ অসীম কুমার রক্ষিতের প্রতিষ্ঠিত যৌথ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান “সিডি প্যাথ হাসপাতাল”-এ চাকরির মাধ্যমেই তার নতুন জীবনের সূচনা হয়।
তিনি বলেন, “১৯৮৯ সালে সিডি হাসপাতালে যোগদান করি। হাসপাতালের মালিক ও পরিচালকদের ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং আন্তরিকতাই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।”
দীর্ঘ ৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি শুধু দায়িত্ব পালনই করেননি, মানবিকতা ও আন্তরিকতা দিয়ে জয় করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অসংখ্য মানুষের হৃদয়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করেছেন তিনি। বড় ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ব্যবসায়, মেয়েকে বিএসসি নার্সিংয়ে পড়িয়েছেন এবং ছোট ছেলেকে কুমিল্লার আওয়ার লেডি অব ফাতিমা গার্লস স্কুল, জিলা স্কুল ও ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন লন্ডনে।
পরবর্তীতে তার ছোট ছেলে লন্ডনে প্রথমে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে সেখানে একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে লন্ডনের মাটিতে কুমিল্লাকে পরিচিত করতে গড়ে তোলেন “কুমিল্লা ওরিয়ন্স ক্লাব”, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি লাভ করেছে।
খেলাধুলার প্রতিও ছিল হাছান ভাইয়ের গভীর অনুরাগ। এলাকার তরুণদের মাঠমুখী রাখতে প্রতিবছর আয়োজন করতেন বিভিন্ন টুর্নামেন্ট। বিশেষ করে ৯০-এর দশকে টেনিস ক্রিকেটে “লিভারপুল ক্লাব”-এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ।
ক্রিকেটার ফখরুল আলম উল্লাস, লেলিন, বগলু, বাবু ও টিপুসহ অনেক সাবেক খেলোয়াড় আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তার অবদান। ক্লাবের জন্য বল, ব্যাট, টুর্নামেন্ট ফি কিংবা খেলোয়াড়দের খাবারের প্রয়োজন হলে কাউকে কিছু বলতে হতো না—হাছান ভাই নিজ উদ্যোগেই সবকিছুর ব্যবস্থা করতেন।
নিজের সামর্থ্যের হিসাব না করে তিনি শুধু চাইতেন এলাকার ছেলেরা মাঠে থাকুক, ভালো থাকুক এবং মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে থাকুক।
খেলা চলাকালে যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, মাঠে উপস্থিত থাকতেন তিনি। দল জিতলে তার আনন্দ দেখে মনে হতো যেন নিজের সন্তানের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত একজন পিতা।
শুধু খেলাধুলাই নয়, মানবিক কাজেও ছিলেন অসাধারণ। হাসপাতালে পরিচিত কোনো রোগী গেলে ডাক্তার দেখানো, ওষুধের ব্যবস্থা করা, বিল কমিয়ে দেওয়া, এমনকি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করাও ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। অনেক অসহায় মানুষকে নীরবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। এমনকি অনেক সময় বাসায় ফেরার ভাড়াও নিজেই দিয়ে দিতেন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তিনি এসব করেছেন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। কখনো প্রচার কিংবা প্রতিদানের আশায় নয়, শুধুমাত্র মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সমাজে অর্থবিত্তশালী মানুষের অভাব নেই, কিন্তু “মনের দিক থেকে ধনী” মানুষ খুব কম। হাছান ভাই সেই বিরল মানুষদের একজন, যার হৃদয়জুড়ে রয়েছে সীমাহীন মায়া, আন্তরিকতা ও মানবতা।
আজও কুমিল্লা শহরের কোথাও সাবেক খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা হলে তিনি হাসিমুখে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, “এইটা আমার টিমের প্লেয়ার…”—এই একটি বাক্যের মধ্যেই ফুটে ওঠে তার গভীর ভালোবাসা ও আত্মিক সম্পর্ক।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা জানান, বহুবার তারা হাছান ভাইকে সংবর্ধনা দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কারণ, এমন মানুষকে সম্মান জানানো মানে শুধু একজন ব্যক্তিকেই নয়—মানবতা, খেলাধুলা এবং সামাজিক মূল্যবোধকেও সম্মান জানানো।
তাদের বিশ্বাস, সমাজে যদি হাছান ভাইদের মতো মানুষের সংখ্যা বাড়ে, তাহলে যুব সমাজ আবার মাঠে ফিরবে, ফিরে আসবে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি।
সবশেষে এলাকাবাসীর একটাই প্রার্থনা—আল্লাহ যেন হাছান ভাইকে সুস্থ ও ভালো রাখেন। কারণ, এমন মানুষদের জন্যই পৃথিবীটা এখনো এত সুন্দর মনে হয়।
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
দুই বদলির ৩ গোল, সুইজারল্যান্ডের বড় জয়
গোল মিলছিল না কিছুতেই। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনলেন সুইজারল্যান্ড কোচ মুরাত ই...
ডেভিডের হ্যাটট্রিক, কাতারের জালে কানাডার ৬
প্রথম আধা ঘণ্টার একটু বেশি সময়ে দুই গোল খেয়ে এবং একজনকে হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ল কাতার। বিরতির আগে তার...
কোরিয়াকে হারিয়ে সবার আগে নকআউট পর্বে মেক্সিকো
দুর্ভাগ্যজনকভাবে পিছিয়ে পড়ার পর প্রাণপণ চেষ্টা করল দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু ব্যবধান আর ঘুচাতে পারল ন...
তিতাসে থানা গেইটে প্রতিপক্ষের হামলা ও কোদাল দিয়ে বড় ভাইকে হ...
নাজমুল করিম ফারুক কুমিল্লার তিতাসে ছোট ভাইয়ের কোদালের আঘাতে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের স্ত্...
নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি অং...
নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদারের...
মিড ডে মিলে বদলাচ্ছে শ্রেণিকক্ষের চিত্র
মো. আনোয়ারুল ইসলাম।।দুপুরের বিরতি শেষে ক্লান্ত মুখে শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসা কিংবা খাবার খেতে বাড়ি গিয়ে...