মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, কৈশোর থেকেই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে তুহিন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে তার পরিবার।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে তুহিনসহ চারজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এরই মধ্যে তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের ভাষ্য, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সানন্দা এলাকার মৈশানবাড়ির বাসিন্দা নুর আলম ও শিরিন আক্তার দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় তুহিন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক সহপাঠীকে মারধরের অভিযোগে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয় সে। এরপর আর পড়াশোনায় ফেরেনি তুহিন।
সোমবার সকালে সরেজমিনে সানন্দা এলাকার মৈশানবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ কক্ষের টিনশেড বাড়িটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। ঘরের ভেতরে তুহিনের মা শিরিন আক্তার ছোট ছেলেকে নিয়ে ছিলেন। আশপাশের প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
পরে জানালা দিয়ে ডাক দিলে সাড়া দেন শিরিন আক্তার। রোববার গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি বলেছিলেন, তার ছেলে অপরাধী হলে তার বিচার হওয়া উচিত। তবে সোমবার তুহিন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
শিরিন আক্তার জানান, ঘটনার পরদিন পুলিশ তাদের বাড়িতে এলে তিনি তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখা আইফোনটি পুলিশকে বের করে দেন। তবে ফোনটি সেখানে কীভাবে এলো, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
তুহিনের বাবা নুর আলম কোথায়—জানতে চাইলে শিরিন আক্তার বলেন, তার স্বামী কোথায় আছেন, তিনি জানেন না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্কুল থেকে বহিষ্কারের পর তুহিন ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কিশোর-তরুণদের নিয়ে একটি দল গড়ে তোলে সে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও কোটবাড়ি এলাকায় বিভিন্ন স্থানে তাদের আড্ডা বসত বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, কোটবাড়ি প্রত্নস্থল ও আশপাশে দর্শনার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়, ছিনতাই এবং মোটরসাইকেল চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে তুহিনের দলের সদস্যরা জড়িত ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা দক্ষিণে একটি লাল একতলা পাকা বাড়িতে তুহিনের আড্ডা বসত বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই বাড়ির ছাদে বসে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, ছিনতাই ও চুরির পরিকল্পনা করত তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা সবুজ হোসেন বলেন, তুহিনের চেয়ে বয়সে বড় তরুণরাও তার সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিত।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ভয়ের কারণে অনেকে এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতেন না। তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আত্মসাতের অভিযোগে সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এসব পুরোনো অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তুহিনের নাম সামনে আসে। ফুটেজে নিখোঁজ হওয়ার আগে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে হাঁটতে দেখা যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
পুলিশের দাবি, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে তুহিন অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। পরে তার মৃত্যু হলে আইফোন নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় আসামিরা।
এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন কিশোর হওয়ায় সংশোধনাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। মামলার তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর তুহিনের পরিবারের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। তুহিনের মা শিরিন আক্তার দাবি করেছেন, ছেলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। অন্যদিকে ঘটনার পর থেকে তুহিনের বাবা নুর আলমেরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় তুহিনের প্রভাব ছিল। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন কিশোর-তরুণ চলাফেরা করত। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও একাধিক কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে এসেছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কোটবাড়ি প্রত্নস্থল ও লালমাই পাহাড় একই বিস্তৃত এলাকায় অবস্থিত। এখানে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা ও পর্যটনকেন্দ্র। এসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, অপ্রতিমকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কিশোর গ্যাংসহ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা জোরদারেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।