প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: বৃহত্তর কুমিল্লা | প্রকাশ: 22 Sep 2026, 9:51 AM
মোকাম ইউনিয়নে গোলাম সারোয়ারের উন্নয়ন জাদুতে গ্রামীণ যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা
সাদিক মামুন
‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে, জাদু জানে, জাদু জানে রে, আমার বন্ধু মহা জাদু
জানে’... জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হাবিব ওয়াহিদের গাওয়া এই গানের লাইনের মতোই
যেন এক জাদুকরী বাস্তবতার দেখা মিলেছে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। তবে
তিনি কোনো মঞ্চের জাদুকর নন, তিনি এক নিঃস্বার্থ সমাজসেবক। তাঁর নাম
গোলাম সারোয়ার। তিনি কুমিল্লার বিশিষ্ট দানবীর, শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব
জুনাব আলীর কনিষ্ঠপুত্র। যার হাতের ছোঁয়ার জাদুতে বুড়িচং উপজেলার মোকাম
ইউনিয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সাধিত
হয়েছে।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের সংযোগ সড়কগুলোর দীর্ঘদিনের
বেহাল দশার অবসান ঘটেছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে মূল সড়কগুলোর
অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সম্ভব হলেও অবহেলিতই থেকে যাচ্ছিল এখানকার
২৭টি গ্রামের বেশিরভাগ সংযোগ সড়ক। ফলে বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে
কাদা-পানি আর শুষ্ক মৌসুমে খানাখন্দের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো
হাজার হাজার গ্রামবাসীকে। অবশেষে গ্রামবাসীদের এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ
থেকে পরিত্রাণ দিতে এগিয়ে এসেছেন এক মানবিক সমাজহিতৈষী। মোকাম
ইউনিয়নের নিমসারের শিকারপুর গ্রামের প্রয়াত দানশীল ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব
আলহাজ্ব জুনাব আলীর কনিষ্ঠ পুত্র আলহাজ্ব গোলাম সারোয়ার সম্পূর্ণ নিজস্ব
অর্থায়নে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমেনা-জুনাব আলী ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নে
প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬টি সংযোগ সড়ক নতুন করে মেরামত ও
সংস্কার করা হয়েছে। সেই সাথে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে নির্মাণ করা হয়েছে চারটি
ড্রেন, কালভার্ট ও গাইডওয়াল।
মোকাম ইউনিয়নে নতুন করে মেরামত ও সংস্কার করা সংযোগ সড়কগুলো হচ্ছে-
কাবিলা বাজার কোল্ডস্টোর এলাকা, শিকারপুর-বাড়াইল-চিতাখোলা, শিকারপুর-নতুন
বানার বাড়ি, বাড়াইল চিতাখোলা-লোদন, শিকারপুর জারিয়া এগ্রো ফার্ম-
মুরগির ফার্ম, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন মনিপুর-চাঁনগাছা,
চাঁনগাছা-লতিফ মাস্টারের, ভারিকোটা-চিতাখোলা-শিকারপুর, কাবিলা বাজার
হতে চাঁনগাছা জামে মসজিদ পর্যন্ত ও দুটি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, কোরপাই
মিলগেইট হতে কাকিয়ার চর রফিজ উদ্দিন চেয়ারম্যানের বাড়ির পর্যন্ত, পাঁচকিত্তা
পূর্বপাড়া জামে মসজিদ হতে ইলিয়াসের বাড়ি পর্যন্ত, মনিপুর পশ্চিম পাড়ায়
জামে মসজিদের নতুন ড্রেন নির্মাণ, ভারিকোটা পাকা সড়ক হতে দোকান ঘর
এবং জামে মসজিদ পর্যন্ত, পাঁচকিত্তা হতে জঙ্গালিয়া যাওয়ার মাঝখানের অংশ,
পাচকিত্তা প্রাইমারি স্কুলের পূর্ব দিক হতে মনশাসনের জলা পর্যন্ত নতুন ড্রেন
নির্মাণ, কাকিয়ার চর মধ্যপাড়া সানাউল্লার বাড়ির সামনে হতে কাসেমের বাড়ি
পর্যন্ত এবং ভারিকোটায় মোহন মেম্বার, আর্মি অলিউল্লাহ ও আব্দুল বারেকের
বাড়ির সামনে চলাচলের রাস্তা রক্ষার্থে গাইডওয়াল নির্মাণ।
এছাড়াও শিকারপুর গ্রামের শেষ মাথা থেকে বাড়াইরের এক কিলোমিটার ফসলি
জমির প্রায় দুই ফুট চওড়া আইল ছিল, কাদা মাড়িয়ে চলতে হতো। গাড়ি দূরে
থাক, মানুষের হাঁটার ব্যবস্থাও ছিল না। সরকারি উদ্যোগ না থাকায় গোলাম
সারোয়ার প্রায় ১ কিলোমিটার জমির আইলটি ১৫ ফুট চওড়া সড়কে দৃশ্যমান রূপ
দেন। এখন এই সড়কে গ্রামের মানুষের জন্য কৃষি পণ্য বহন, রোগীকে জরুরি
হাসপাতালে নেওয়া ও বাজারে গবাদিপশুসহ যাতায়াত সহজ হয়েছে।
সংযোগ সড়কগুলোর আমূল পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ যোগাযোগ ও
অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এখনকার কৃষকরা তাদের
উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের অন্যতম বৃহত্তম সবজি বাজার নিমসারে এবং গবাদি পশুর
হাট ময়নামতির সাবের বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন। কেবল তাই নয়, সংযোগ
সড়কগুলোর এই বেহাল দশার কারণে আত্মীয়-স্বজনরাও গ্রামে আসতে চাইত না,
সামাজিক সম্পর্কগুলোও কেমন যেন দূরত্বে রূপ নিয়েছিল। এখন সড়কগুলো মেরামত
হওয়ায় ধরনের সম্পর্কের ও ব্যাপক উত্তরণ ঘটেছে। এছাড়াও মহাসড়কে তীব্র যানজট
দেখা দিলে কয়েকটি সংযোগ সড়ক ব্যবহার করে অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস
নিমসারের যানজট প্রবণ এলাকা অতিক্রম করতে পারবে। স্থানীয়রা জানান, এই
সড়কগুলো সংস্কারের ফলে শুধু অর্থনৈতিক সুবাতাসই বইছে না, বরং সুন্দর ও
মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় গ্রামগুলোর মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের
এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।
বুড়িচংয়ের নিমসার গ্রামের বাসিন্দা ও নিমসার জুনাব আলী কলেজের সভাপতি
এডভোকেট শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম
ইউনিয়নে অসংখ্য শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই ইউনিয়নের অনেকেই
রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানেও রয়েছেন।
একসময়কার অবহেলিত মোকাম ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত,
গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়নে এবং শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার
ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছিলেন এই ইউনিয়নের শিকারপুর গ্রামের দানশীল ও
শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব প্রয়াত আলহাজ্ব জুনাব আলী। স্বাধীনতাত্তোর ও পরবর্তী
সময়ের তিন দশক ধরে তিনি মোকাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের মধ্য
দিয়ে ব্যাপক মানবিক কর্মযজ্ঞ করে গেছেন। আলহাজ্ব জুনাব আলীর মৃত্যুর পর তাঁর
কনিষ্ঠ পুত্র আলহাজ্ব মো. গোলাম সারোয়ার পিতার মানবিক কর্মযজ্ঞের হাল ধরেন।
আমরা জানি, একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল
চাবিকাঠি হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমাদের মোকাম ইউনিয়নের
বেশিরভাগ গ্রামেই সংযোগ সড়কগুলোর বেহাল দশার কারণে পুরো এলাকার উন্নয়ন
স্থবির হয়ে পড়েছিল। বর্ষা এলে আমাদের দুর্ভোগের কোনো সীমা থাকত না।
সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে কুমিল্লার দানবীর ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব
জুনাব আলী সাহেবের সুযোগ্য সন্তান সমাজ হিতৈষী, মানবিক ব্যক্তিত্ব
গোলাম সারোয়ার যেভাবে নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে ১৬টি সড়ক ও ড্রেন-কালভার্ট
সংস্কার করে দিলেন, তা সত্যি এক বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত। এলাকার সর্বস্তরের মানুষ
তাঁর এই মহতী কাজের প্রতি কৃতজ্ঞ।
মোকাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষক, ব্যবসায়ী সহ মুরুব্বীরা জানান,
গ্রামের সংযোগ সড়কগুলোর বেহাল দশার কারণে মাঠ থেকে ফসল বাজারে আনা ছিল
এক বড় যুদ্ধ। এখন জুনাব আলী সাহেবের পুত্র গোলাম সারোয়ারের এই মানবিক
উদ্যোগে সংযোগ সড়কগুলো মেরামত ও সংস্কার হওয়ায় কৃষকেরা খুব সহজেই
তাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজি বাজার নিমসারে এবং আশপাশের
অন্যান্য বাজারে নিয়ে যেতে পারছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন আরও
চাঙ্গা হচ্ছে, তেমনি বাজারে সবজির সরবরাহ ও যোগান অনেক বেড়েছে। এই
সড়কগুলো এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেমনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তেমনি
ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে এধরণের মহতী ও মানবিক কাজ করার বিষয়ে সমাজহিতৈষী
আলহাজ্ব গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘আমি বুড়িচংয়ের মোকাম ইউনিয়নের
সন্তান। এই ইউনিয়নের ২৭টি গ্রামের ধুলোমাটি আমার গায়ে মিশে আছে।
মোকামের অবহেলিত সংযোগ সড়কগুলোর কারণে আমাদের গ্রামের মানুষের কষ্ট ও
গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্থবিরতা আমি নিজে চোখে দেখেছি। আমার পরম শ্রদ্ধেয়
পিতা প্রয়াত আলহাজ্ব জুনাব আলী সারা জীবন এই অঞ্চলের শিক্ষা এবং মানুষের
কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তিনি বলতেন ‘নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেয়ে
সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করা সবচেয়ে বড়
ইবাদত।’ আরেকটি কথা বলতেন-‘নিজের কর্মের মাধ্যমে মরার পরে জিন্দা থাকতে
হবে।’ আমি কেবল তাঁর রেখে যাওয়া সেই আদর্শ ও স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা
করছি।সেই দায়বোধ থেকেই আমেনা-জুনাব আলী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মোকাম
ইউনিয়নের ১৬টি সড়ক ও চারটি ড্রেন-কালভার্ট সংস্কারের উদ্যোগ নিই। এর
আগে আরো কয়েকটি সড়কও মেরামত সংস্কার করেছি। আমার এই প্রচেষ্টা
কোনো প্রচার বা সুনামের জন্য নয়, এটি আমার ইউনিয়নের প্রতি, আমার
পিতার স্মৃতি বিজড়িত এই মাটির প্রতি পরম দায়িত্ব ও ঋণ শোধের একটি ক্ষুদ্র
প্রয়াস মাত্র। আমিও আমার বাবার মতো বিশ্বাস করি, মানুষের সেবার মাঝেই
লুকিয়ে আছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি।’
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
দেবিদ্বারে আত্মহত্যায় বাঁধা দেওয়ায় মাকে কুপিয়ে ও ভাতিজিকে আ...
মোঃ আক্তার হোসেনকুমিল্লার দেবিদ্বারে শারীরিকভাবে অসুস্থ এক যুবককে আত্মহত্যায় বাঁধা দেওয়ায় মাকেকুপিয়ে...
অপ্রতিমের ঘটনার পর শিশু ইসরাত জাহানের ঘটনায় শোকে স্তব্ধ...
মোঃ আক্তার হোসেনকুমিল্লায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকান্ডের রেশ কাটার আগে আট মাসেরশিশু ই...
অপ্রতিম হত্যা: প্রধান অভিযুক্ত তুহিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ,...
মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা।কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত...
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১২ দফা দাবি নিয়ে কুবি শিক্ষার্থীদ...
কুবি প্রতিনিধি:কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থী অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও...
অপ্রতিম হত্যার বিচারের দাবিতে কুবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
কুবি প্রতিনিধি:কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশ...
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে নতুন তথ্য, মায়ের তিন দাবি
আব্দুল্লাহ, কুবি:কুমিল্লায় আলোচিত কিশোর ইশরাত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় দিনেও উত্তাল কুমিল...