প্রতিবেদক: Raisul Islam Shohag | ক্যাটেগরি: আন্তর্জাতিক | প্রকাশ: 20 Aug 2026, 9:26 AM
হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ দেখিয়ে ট্রাম্পের পোস্ট, ইরানের পাল্টা জবাব
ট্রাম্পের পোস্টে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে এর আগে তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। নতুন পোস্টের মাধ্যমে সেই অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।
ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করেছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তেহরান বলেছে, হরমুজ প্রণালি ইরানের থাকবে।
ট্রাম্পের মানচিত্রে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’
মঙ্গলবার ট্রাম্প তার Truth Social অ্যাকাউন্টে হরমুজ প্রণালির একটি মানচিত্র পোস্ট করেন। সেখানে প্রণালিটিকে ঘিরে “New U.S. Territory” লেখা ছিল। এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। একই সময়ে তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে হরমুজ দিয়ে কোনো জাহাজ মার্কিন অনুমতি ছাড়া চলাচল করতে পারবে না।
ট্রাম্পের সর্বশেষ পোস্টের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি বাস্তবে হরমুজের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে? আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী জলপথ এবং এর বিভিন্ন অংশ উপকূলবর্তী দেশগুলোর আঞ্চলিক জলসীমার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি ঘোষণা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মানচিত্রের মাধ্যমে কোনো জলপথের আইনগত সার্বভৌমত্ব পরিবর্তিত হয় না।
ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের পোস্টের পর ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ট্রাম্পের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, হরমুজ প্রণালিকে কোনো পোস্ট, বিমানবাহী রণতরী বা প্রেসিডেন্টের নির্দেশের মাধ্যমে দখল করা যায় না। ইরানের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর উপকূলবর্তী দেশগুলোর অধিকার রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা কোনো ঘোষণা এর আইনগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে না। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক চলাচল পুনরায় চালু হবে না।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা নেই
হরমুজকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানো মানচিত্র প্রকাশের একই সময়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন কোনো আলোচনাও নির্ধারিত হয়নি। মঙ্গলবার Truth Social-এ ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ‘আলোচনা বা কথোপকথন’ চলছে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকার কথা জানান।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ৬০ দিনের সমঝোতা ও আলোচনার সময়সীমা ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আবারও বেড়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বাধা তৈরি হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান সংঘাতের কারণে হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এই জলপথ এড়িয়ে চলছে।
মানচিত্র নিয়ে নতুন উত্তেজনা
ট্রাম্পের পোস্টকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলেও এর কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি সরাসরি ইরান ও ওমানের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এবং সামুদ্রিক আইনকে স্পর্শ করে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্পের মানচিত্রে হরমুজের পাশাপাশি ইরানের ভূখণ্ডের কিছু অংশও চিহ্নিত এলাকার মধ্যে পড়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পোস্টটি শুধু জলপথের নিয়ন্ত্রণ নয়, ইরানের ভূখণ্ড নিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন দাবির প্রশ্নও সামনে এনেছে।
ইরানের পাল্টা ব্যঙ্গ
ট্রাম্পের পোস্টের জবাবে ইরানের একটি সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াকে ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানো একটি ব্যঙ্গাত্মক মানচিত্র প্রকাশ করেছে। ইরানের হায়দরাবাদ কনস্যুলেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ওই মানচিত্রে ক্যালিফোর্নিয়াকে “NEW TERRITORY OF ISLAMIC REPUBLIC OF IRAN” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ট্রাম্পের হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে দেখানোর পোস্টের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংকট তাদের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক উত্তেজনাও বাড়ছে
হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ ইতোমধ্যে বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির অভিযোগ, সামুদ্রিক এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহযোগিতা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ফলে সংকটের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কূটনীতির পথ কতটা খোলা?
ট্রাম্পের সর্বশেষ পোস্ট এবং ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে তেহরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করছে। ফলে হরমুজ এখন শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ফ্ল্যাশপয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
সামনে কী?
ট্রাম্পের ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে হরমুজকে চিহ্নিত করা মানচিত্র কোনো আইনগতভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ড পরিবর্তন করেনি। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে নতুন একটি ভূরাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।একদিকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালির সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা বাড়বে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়—এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।
--
এই সংবাদটি শেয়ার করুন
অন্যান্য খবর
শিক্ষা-গবেষণায় বাস্তবমুখী জ্ঞানচর্চার তাগিদ কুবি উপাচার্যের
কুবি প্রতিনিধি :কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ‘সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা’ শীর্ষ...
হোমনায় উচ্ছেদের পর ফের সড়ক দখল ভোগান্তিতে পথচারীরা
মো. আবুল বাসার সরকার কুমিল্লার হোমনা পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত দ...
প্যারোলে মুক্তি পেলেন ডা. দীপু মনি
স্বামীর মৃত্যুতে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ড...
ব্রাহ্মণপাড়ায় সালিশে নারীকে জুতাপেটা, ইউপি চেয়ারম্যান বললেন-...
মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি।।কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়ন...
হোমনায় ৭ বছরের শিশুর উলঙ্গ লাশ উদ্ধার
হোমনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:কুমিল্লার হোমনায় আয়েশা বেগম (৭) নামে এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে এলাকায়...
২৩ মামলার আসামী মাদক সম্রাট কসাই রুবেল ফের গ্রেফতার
ফয়সল আহমেদ খান, বাঞ্ছারামপুর ( ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার শ...