কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লা সদর উপজেলার রাজমঙ্গলপুর এলাকায় এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ঘরে ঢুকে মারধর, শ্লীলতাহানি, ভাঙচুর এবং নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করে কুমিল্লা কোতোয়ালী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীর বাবা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী জান্নাতুল ফেরদৌস কুমিল্লা নগরীর রাজমঙ্গলপুর মধ্যমপাড়া এলাকায় বসবাস করেন। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মরত থাকায় তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এই সুযোগে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৬ জুন শুক্রবার সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে নয়ন হোসেন রাফি, আমেনা বেগম ফাহিমা, মনির হোসেন, নাইমা আক্তার স্মৃতিসহ আরও কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভুক্তভোগীর বাড়িতে প্রবেশ করেন। অভিযোগে বলা হয়, বাড়িতে প্রবেশ করেই তারা ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র নষ্ট করে। এ সময় জান্নাতুল ফেরদৌস বাধা দিতে গেলে তাকে কিল-ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলাকারীরা তার মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করেন। একপর্যায়ে তার গলা চেপে ধরা হয় এবং তলপেটে লাথি মারা হয়। পাশাপাশি পরনের কাপড় টানাহেঁচড়া করে তাকে শ্লীলতাহানিরও অভিযোগ আনা হয়েছে। হামলার সময় তার দুই শিশু সন্তান আতঙ্কিত হয়ে পড়লে তাদেরও ধাক্কাধাক্কি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে হামলার একপর্যায়ে অভিযুক্তরা ঘরের আলমারি ভেঙে নগদ ৭০ হাজার টাকা, প্রায় দেড় ভরি স্বর্ণালঙ্কার, দুটি স্মার্টফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র, সন্তানদের জন্মনিবন্ধন সনদ, জমি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসহ আনুমানিক ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে জান্নাতুল ফেরদৌস এবং তার দুই সন্তান—আসাদুজ্জামান রুমান (১১) ও জান্নাতুল মাওয়া (৭)-কে উদ্ধার করেন। পরে আহতদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অভিযোগকারী মো. আবদুর রশিদ বলেন, মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ঘটনার পরপরই থানায় যেতে পারেননি। চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর তিনি কোতোয়ালী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কুমিল্লার একাধিক মামলার সাজাপ্রাপ্ত ও কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচয়দানকারী সোর্স হোসেন। তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অভিযুক্তদের মদদ দিচ্ছেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তি পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা না করার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন এবং থানায় অভিযোগ করলেও কোনো লাভ হবে না বলে হুমকি দিচ্ছেন।
মো. আবদুর রশিদ বলেন, সোর্স হোসেন ও আওয়ামীলীগ নেতা মনির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তার মেয়ের পরিবারকে এলাকা ছাড়ার জন্য নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এমনকি শিশু সন্তানদের লেখাপড়াও ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রবাসীর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরে বারবার হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত আমেনা বেগম ফাহিমা একজন মাদক ব্যবসায়ী। তার পরিবারের সদস্যরাও মাদক-সংক্রান্ত মামলায় জড়িত। ফলে বিভিন্ন সময় মাদকসেবী ও মাদককারবারীরা একজোট হয়ে আমাদের উপর অত্যাচার নিপিড়ন করে।
তিনি বলেন, আমার স্বামী বিদেশে থাকেন। বাড়িতে কোনো অভিভাবক নেই। আমি দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করি। এই সুযোগে তারা বারবার আমাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আমরা এখন বাড়িছাড়া অবস্থায় আছি। সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি ও আমার পরিবারের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু বিচার চাই।
অভিযোগকারী হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগে নাম উল্লেখ থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুমিল্লা কোতোয়ালী মডেল থানার পুলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার থানায় অভিযোগ করেছে, শুনেছি জমি সংক্রান্ত বিরোধ আছে, আমি উভয় পক্ষকে আসতে বলেছি, তারা আসলে বিস্তারিত জানতে পারবো।